ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশবাসীকে বিদেশ ভ্রমণ কমানো, স্বর্ণ কেনা থেকে বিরত থাকা এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী জীবনযাপন করার আহ্বান জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
রবিবার দক্ষিণ ভারতের হায়দারাবাদ শহরে এক জনসভায় তিনি এই আহ্বান জানান।
মোদি বলেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় যেভাবে বিশ্বজুড়ে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাসা থেকে কাজের সংস্কৃতি চালু হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতেও মানুষকে সেই পদ্ধতিতে ফিরে যেতে হবে।
তার ভাষায়, অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমলে জ্বালানি খরচও কমবে।
তিনি অনলাইন বৈঠক বাড়ানো, গণপরিবহন ব্যবহার এবং কারপুলিংয়ের ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে পরিবারগুলোকে রান্নার তেলের ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এটি যেমন স্বাস্থ্যসম্মত, তেমনি দেশপ্রেমেরও পরিচায়ক।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী অন্তত এক বছরের জন্য অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর বন্ধ রাখার আহ্বান জানান। পাশাপাশি তিনি ভারতীয়দের স্বর্ণ কেনা থেকেও বিরত থাকার অনুরোধ করেন।
এছাড়া কৃষকদের সার ব্যবহারের পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনারও আহ্বান জানান তিনি।
মোদি বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়ের ওপর আমাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।”
কেন উদ্বিগ্ন ভারত?
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগের দিন অর্থাৎ ২৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭২ দশমিক ৮৭ ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৫ ডলারের বেশি, যা প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি।
যুদ্ধের শুরুতে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হামলার কারণে সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। পরে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনকে আরও জটিল করে তোলে।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হতো। বর্তমানে ইরান সীমিত কিছু দেশের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে।
অন্যদিকে এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগামী জাহাজে নৌ অবরোধ ঘোষণা করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
জ্বালানির দাম বাড়ায় আন্তর্জাতিক বিমান ভাড়াও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বিদেশ সফরে চাপ তৈরি হয়েছে।
এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া ও অন্যান্য সার রফতানি হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেই সরবরাহও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার তথ্যানুযায়ী, ১ মে পর্যন্ত দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৬৯০ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার।
মার্চের শেষের তুলনায় এটি প্রায় ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার কম। যুদ্ধ শুরুর আগে ২৭ ফেব্রুয়ারি ভারতের রিজার্ভ ছিল ৭২৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৬ সালে ভারতের চলতি হিসাব ঘাটতি (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট) দাঁড়াতে পারে ৮৪ বিলিয়ন ডলারে।
তেল, স্বর্ণ ও বিদেশ ভ্রমণ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ। গত অর্থবছরে দেশটি ১২৩ বিলিয়ন ডলারের অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে।
এর পরেই রয়েছে স্বর্ণ আমদানি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত ৭২ বিলিয়ন ডলারের স্বর্ণ আমদানি করেছে, যা বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
বিদেশ ভ্রমণেও ভারতীয়দের ব্যয় ব্যাপক। ২০২৩-২৪ সালে বিদেশ সফরে ভারতীয়রা প্রায় ৩১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন।
এছাড়া ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইউরিয়া সার আমদানিকারক দেশ। গত বছর দেশটি প্রায় ১ কোটি টন ইউরিয়া আমদানি করেছে। সূত্র: আল-জাজিরা
বিডি প্রতিদিন/একেএ