প্রতি বছর বসন্তের আগমন মানেই জাপানের রাস্তাঘাটে মাস্ক পরিহিত লাখ লাখ মানুষের ব্যস্ত পথচলা। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে কোনো মহামারি ধেয়ে আসছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো এটি এক বিশাল প্রাকৃতিক বিড়ম্বনা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে তীব্র রূপ নিয়েছে 'হে ফিভার' (পরাগরেণুজনিত অ্যালার্জি)। এই সংকটের পেছনে কোনো আধুনিক দূষণ বা ভাইরাসের হাত নেই, বরং দায়ী আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে নেওয়া সরকারের একটি ভুল পরিবেশগত সিদ্ধান্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নেওয়া একটি বনায়ন প্রকল্প আজ পুরো জাপানের জন্য বড় জাতীয় স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জ্বালানি সংকটের কারণে জাপান তাদের প্রাকৃতিক বনাঞ্চল উজাড় করেছে। এর ফলে টোকিও, ওসাকা ও কোবের মতো বড় বড় শহরের চারপাশের পাহাড়গুলো সম্পূর্ণ ন্যাড়া হয়ে যায়। এটাই পরবর্তী সময়ে ভয়াবহ ভূমিধস এবং বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই বিপর্যয় রুখতে এবং দ্রুত পাহাড়গুলোকে সবুজে ঢাকতে ১৯৫০-এর দশকে বড় সরকারি বনায়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। করের টাকায় অর্থায়িত এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল দ্রুত বর্ধনশীল এবং নির্মাণকাজে উপযোগী গাছের মাধ্যমে বনাঞ্চল গড়ে তোলা।
তৎকালীন প্রশাসন দ্রুত ফলাফলের আশায় পুরো বনাঞ্চল জুড়ে কেবল দুই প্রজাতির চিরহরিৎ গাছের চারা রোপণ করে। গাছ দুটি হলো জাপানি সিডার (সুগি) এবং জাপানি সাইপ্রেস (হিনোকি)। বর্তমানে এই দুই প্রজাতির কৃত্রিম বন জাপানের মোট ভূমির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (১০ মিলিয়ন হেক্টর) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এই একমুখী বনায়নই আজকের সংকটের মূল উৎস। এই গাছগুলো পরিণত বয়সে পৌঁছানোর পর বসন্তকালে বাতাসে বিপুল পরিমাণ হালকা পরাগরেণু ছড়াতে শুরু করে। এগুলো বাতাসের তোড়ে সহজেই শহরগুলোতে প্রবেশ করে। এতেই কোটি কোটি মানুষকে অসুস্থ হচ্ছেন।
জাপানের বর্তমান জনসংখ্যার প্রায় ৪৩ শতাংশ মানুষ এই মাঝারি থেকে তীব্র অ্যালার্জির সমস্যায় ভুগছেন। এটা যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বহুগুণ বেশি। এই অ্যালার্জির কারণে মানুষের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে এবং কর্মক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। কেবল শারীরিক কষ্টই নয়, এর একটি বিশাল অর্থনৈতিক ধাক্কাও রয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, এই অ্যালার্জির পিক সিজনে কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি এবং মানুষের কেনাকাটা কমে যাওয়ার কারণে জাপানের প্রতিদিন প্রায় ১.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। ফলে ২০২৩ সালে দেশটির সরকার একে একটি 'জাতীয় সামাজিক সমস্যা' হিসেবে ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
কৃত্রিমভাবে তৈরি এই সুগি ও হিনোকির বনগুলোতে প্রবেশ করলে এক অদ্ভুত নীরবতা টের পাওয়া যায়। যেহেতু সব গাছ একই জাতের এবং একই উচ্চতার, সেখানে আলো-বাতাস ঠিকমতো পৌঁছায় না এবং বন্যপ্রাণী ও পাখির আনাগোনা নেই বললেই চলে। জাপানের মূল প্রাকৃতিক বনাঞ্চল যেখানে জীববৈচিত্র্যে ভরপুর, সেখানে এই কৃত্রিম বনগুলো এক প্রকার মরুভূমির মতো নিথর। এই পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা কাটাতে এবং পরাগরেণুর প্রকোপ কমাতে জাপান সরকার আগামী ৩০ বছরের মধ্যে বাতাসে রেণুর পরিমাণ অর্ধেক করার এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার প্রথম ১০ বছরে সুগি বনের পরিমাণ ২০ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে ২৫ মিলিয়ন একর বনভূমির বিশাল অংশ কেটে ফেলা এবং তা আবার পরিবেশবান্ধব উপায়ে প্রতিস্থাপন করা সহজ কাজ নয়। কারণ শুধু গাছ কেটে ফেললে পুনরায় ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়বে এবং জাপানের জলবায়ু সুরক্ষার লক্ষ্য ব্যাহত হবে। তাই কোবে এবং ওসাকার মতো শহরগুলোতে স্থানীয় প্রশাসন ইতিমধ্যেই এই কৃত্রিম বন কেটে সেখানে স্থানীয় জাতের চওড়া পাতার প্রাকৃতিক গাছ লাগানোর কাজ শুরু করেছে, যার ফলে বন্যপ্রাণী ও বিরল কীটপতঙ্গ আবার বনে ফিরতে শুরু করেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাপান সরকার প্রযুক্তি এবং আধুনিক চিকিৎসার ওপরও জোর দিচ্ছে। বাতাসে পরাগরেণুর উপস্থিতি ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে দেশজুড়ে রোবট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। ফলে নাগরিকরা আগে থেকেই সতর্ক হতে পারেন। পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা এমন এক বিশেষ ধরনের জিনগতভাবে পরিবর্তিত চাল উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন, যা নিয়মিত খেলে এই অ্যালার্জির উপসর্গ থেকে মুক্তি মিলবে। এছাড়াও এই বনায়ন কার্যক্রমের খরচ জোগাতে ২০২৪ সাল থেকে প্রত্যেক নাগরিকের ওপর বছরে এক হাজার ইয়েন কর বসানো হয়েছে।
তবে পরিবেশবিদদের একাংশ মনে করছেন, কেবল অ্যালার্জি দূর করার সংকীর্ণ লক্ষ্য নিয়ে কাজ করলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন জাপানে প্রতি বছর নির্ধারিত সময়ের আগেই বসন্ত চলে আসছে এবং পরাগরেণু ছড়ানোর সময়কাল দীর্ঘ হচ্ছে। তাছাড়া পুরোনো হয়ে যাওয়া এই কৃত্রিম বনগুলো এখন আগের চেয়ে কম কার্বন শোষণ করছে, যা জাপানের নেট-জিরো (কার্বনমুক্ত) হওয়ার লক্ষ্যকে কঠিন করে তুলছে।
সূত্র: বিবিসি
বিডি প্রতিদিন/এনএইচ