দুই সপ্তাহ ধরে হামে আক্রান্ত হয়ে তীব্র জ্বরে ভুগছে এক বছর বয়সী শিশু ইউসুফ। যে রোগটি থেকে তার সুরক্ষিত থাকার কথা ছিল, আজ সেই রোগের কারণেই সে মৃত্যুর মুখোমুখি।
রাজধানীর ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালকে বর্তমানে রূপান্তর করা হয়েছে হামের ওয়ার্ডে। সেখানেই একটি অস্থায়ী নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) বিছানায় মা নাফিসা (২২) তার ছোট্ট সন্তানকে বুকে ধরে রেখেছেন, যাতে মুখের ওপর অক্সিজেন নেবুলাইজারটি ঠিকমতো থাকে। বর্তমানে বৈশ্বিক পর্যায়ে হামের যে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, তার শিকার বাংলাদেশের হাজারো শিশুর একজন এই ছোট্ট ইউসুফ।
আপাতত আইভি ড্রিপ আর অক্সিজেন সিলিন্ডারের ওপর ভর করে টিকে আছে তার নিস্তেজ শরীরটি। চোখে ব্যান্ডেজ বাঁধা, যাতে কিছুটা শান্তিতে ঘুমাতে পারে। তবে চিকিৎসকরা তার বেঁচে থাকার আশা ক্ষীণ বলেই মনে করছেন।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রশাসনিক ও টিকাদান কর্মসূচির স্থবিরতাই মূলত এই নজিরবিহীন সংকটের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে এ পর্যন্ত দেশজুড়ে ৫৫ হাজারেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এবং প্রাণ হারিয়েছে অন্তত সোয়া চারশ’ জন। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল রোগীর চাপে হিমশিম খাওয়ায় সামরিক বাহিনী পরিচালিত ডিএনসিসি হাসপাতালকে হামের চিকিৎসার জন্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়।
আক্রান্তদের সিংহভাগেরই বয়স ১০ বছরের নিচে; যার মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। টিকা বণ্টন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় পুরো দেশজুড়ে যে মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে, তা হাসপাতালের উপচে পড়া ওয়ার্ডগুলো দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) যেখানে পূর্বে বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচির ভূয়সী প্রশংসা করত, সেখানে অপুষ্টি ও নিউমোনিয়ার মতো জটিলতার কারণে বর্তমান প্রাদুর্ভাবে শিশু মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি।
ডিএনসিসি হাসপাতালের একজন কর্তব্যরত নার্স নাজমা খান (৪০) বলেন, আমি কোভিড এবং ২০২৩ সালের ডেঙ্গু সংকটের সময়ও এখানে কাজ করেছি। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি আরও বেশি বেদনাদায়ক, কারণ আক্রান্তদের সবাই শিশু। তারা নিজেদের কষ্টের কথা মুখে প্রকাশও করতে পারছে না।
ইউসুফের মা নাফিসা জানান, চিকিৎসকরা আশঙ্কা করছেন হামের কারণে তার সন্তানের মস্তিষ্কে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, নয় মাস বয়সে ওর যে হামের টিকা পাওয়ার কথা ছিল, তা ও পায়নি। বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই। সেখানে মাত্র একদিনের চিকিৎসার খরচ আমার স্বামীর পুরো মাসের বেতনের দ্বিগুণ।
পাশের আরেকটি বিছানায় ক্লান্ত-বিধ্বস্ত দম্পতি আবদুর রাজ্জাক ও জয়নব তাদের চার সন্তানের মধ্যে তিনজনকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন, যারা সবাই হামে আক্রান্ত। তাদের পাঁচ বছর বয়সী সন্তান ওবায়দুল্লাহকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। আবদুর রাজ্জাক অনুশোচনা করে বলেন, আমার কোনো সন্তানকেই হামের টিকা দেওয়া হয়নি। আত্মীয়-স্বজনরাও সংক্রমণের ভয়ে আমাদের দেখতে আসতে পারছেন না।
হাসপাতালের মেঝেতে কাশির শব্দ, শিশুদের কান্না আর অভিভাবকদের আহাজারি এক দমবন্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অনেক শিশুই জন্মের ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে আক্রান্ত হচ্ছে। সাধারণত মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমে শিশুরা যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পায়, মায়েদের নিজের পুষ্টিহীনতা এবং টিকা না নেওয়ার কারণে এবার সেটিও কাজ করছে না।
বৈশ্বিক দিকে তাকালে দেখা যায়, যুক্তরাজ্যের তুলনায় বাংলাদেশে হামে মৃত্যুর হার অনেক বেশি, এখানে প্রতি ১ হাজার আক্রান্তের মধ্যে প্রায় ৭ জন মারা যাচ্ছে। উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে এই বায়ুবাহিত রোগটি ছড়িয়েও পড়ছে দ্রুত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের সংক্রমণ ঠেকাতে জনসংখ্যার অন্তত ৯৫ শতাংশের টিকাদান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অথচ ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নিয়মিত চার বছর পরপর যে গণ-টিকাদান কর্মসূচি হওয়ার কথা ছিল, তা ব্যাহত হয়। টিকার মজুত কমে যাওয়া এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের শূন্যপদ পূরণ না হওয়া এই সংকটের পথ প্রশস্ত করেছে।
বর্তমানে সরকার ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় চার মিলিয়নেরও বেশি শিশুকে জরুরি টিকাদানের আওতায় এনেছে। তবে অনেকের জন্যই বড় দেরি হয়ে গেছে।
গত মার্চ মাসের শেষে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ১৮ মাস বয়সী ছোট্ট জেরিন। তার মা ময়না খানম এখনও সন্তানের প্রিয় খেলনাটি বুকে জড়িয়ে দিন-রাত কাঁদছেন। তিনি ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, জেরিন ছাড়া আমাদের এই ঘর পুরো শূন্য। ও চলে গেল, কিন্তু আমি কেন বেঁচে আছি?
একই চিত্র ঢাকার গোরস্থানগুলোতেও। সদ্য খোঁড়া মাটির ছোট ছোট ঢিবিগুলো জানান দিচ্ছে, এই মহামারি কত নিভৃত ট্র্যাজেডির জন্ম দিচ্ছে। ১০ মাস বয়সী মোহাম্মদ ইয়াসিনকে সমাহিত করে তার বাবা ওয়াসিম ও মা উলফা পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। টিকা দেওয়ার সামান্য অবহেলা বা সুযোগের অভাব যে কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, বাংলাদেশের এই সংকট আজ তারই এক নির্মম স্মারক।
বিডি প্রতিদিন/এনএইচ