আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করার লক্ষ্যে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো এবং ডেনমার্ক অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছেছে। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের ফলে সৃষ্ট উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গতকাল ব্রাসেলসে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুত্তের সঙ্গে বৈঠক শেষে ড্যানিশ প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন জানান, উত্তরের এই হিমশীতল অঞ্চলে ন্যাটোর উপস্থিতি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। তিনি স্পষ্ট করেন, আর্কটিকের নিরাপত্তা রক্ষা করা কেবল ডেনমার্কের একার দায়িত্ব নয় বরং এটি পুরো ন্যাটো জোটের সামগ্রিক স্বার্থের বিষয়। সাক্ষাৎ শেষে ফ্রেডেরিকসেন তার সোশ্যাল মিডিয়া বার্তায় উল্লেখ করেন, রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় অঞ্চলটিতে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করার বিষয়ে দুই পক্ষই একমত হয়েছে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ন্যাটো প্রধানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এখন গ্রিনল্যান্ডে স্থায়ী ও পূর্ণ প্রবেশাধিকার পেয়েছে। ট্রাম্পের মতে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এবং অন্য কোনো শক্তির নিয়ন্ত্রণ ঠেকাতে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সুসংহত করা প্রয়োজন। যদিও বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিল, তবে ট্রাম্প সম্প্রতি জানিয়েছেন তিনি সেখানে সামরিক শক্তি প্রয়োগের পক্ষপাতী নন। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো মিলে পুরো আর্কটিক অঞ্চলের জন্য একটি ভবিষ্যৎ চুক্তির রূপরেখা তৈরি করছে। অন্যদিকে ডেনমার্ক সরকার শুরু থেকেই বলে আসছে, গ্রিনল্যান্ডের ওপর তাদের সার্বভৌমত্ব কোনোভাবেই আলোচনার বিষয় হতে পারে না। তবে কৌশলগত অন্যান্য বিষয়ে তারা সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত। এই কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনে এক বৈঠকে মিলিত হয়ে পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
জোর করে নয়, কৌশলে নেব : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের ব্যাপারে তার অনড় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তবে এবার তিনি প্রথমবারের মতো জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বীপটি জোরপূর্বক দখল করার কোনো পরিকল্পনা করছে না। তার পরিবর্তে তিনি শুল্কভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড অর্জনের কৌশল গ্রহণ করতে চান। ট্রাম্পের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চীনের মধ্যকার কৌশলগত অবস্থানের কারণেই গ্রিনল্যান্ড আমেরিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ সম্মেলনে গ্রিনল্যান্ডের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে ট্রাম্প এমন কিছু দাবি করেছেন যা ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বক্তব্য চলাকালে ট্রাম্প দাবি করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডকে ডেনমার্কের কাছে ‘ফিরিয়ে দিয়েছিল’। ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে ইতিহাসবিদ ও ফ্যাক্ট-চেকাররা ভুল বলে প্রমাণিত করেছেন। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি ডেনমার্ক আক্রমণ করার পর যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিল এবং সেখানে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছিল, কিন্তু দেশটি কখনোই গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌম মালিক ছিল না। ফলে ‘ফিরিয়ে দেওয়ার’ প্রশ্নটি অবান্তর। ১৯৩৩ সাল থেকেই আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৫৪ সালে জাতিসংঘে যখন গ্রিনল্যান্ডকে ডেনমার্কের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্র নিজেও সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। বর্তমানে গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। সম্মেলনে ট্রাম্পের বক্তৃতায় আরেকটি বড় বিভ্রান্তি তৈরি হয় যখন তিনি বারবার ‘গ্রিনল্যান্ড’-এর পরিবর্তে ‘আইসল্যান্ড’-এর নাম উচ্চারণ করেন। তিনি অভিযোগ করেন আইসল্যান্ডের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে এবং আইসল্যান্ড আমেরিকার অনেক টাকা নষ্ট করছে। অথচ গত কয়েক সপ্তাহে আইসল্যান্ড দখল বা অর্জন নিয়ে ট্রাম্প কোনো মন্তব্যই করেননি। মূলত গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার আগের দিনের মন্তব্যের কারণে মার্কিন বাজারে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল, তিনি সম্ভবত সেটিই বোঝাতে চেয়েছিলেন। -রয়টার্স, আলজাজিরা