ইরান যুদ্ধ জিতল কি না সে আলাপ তর্কসাপেক্ষ হলেও বিশ্বরাজনীতির চেনা মানচিত্র পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে তেহরান। এ যুদ্ধের ফলে ইরান তার শীর্ষ নেতৃত্ব হারানোর পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুতের বড় অংশ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হারিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামান্য কিছু যুদ্ধবিমান হারালেও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পানি ও তেল অবকাঠামো এ যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইসরায়েল ও আরব দেশগুলোর তুলনায় ইরানের জানমালের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক গুণ বেশি, যা যে কোনো যুদ্ধের একটি স্বাভাবিক পরিণতি।
তবে এ যুদ্ধের বস্তুগত ক্ষতির চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে বিশ্বশক্তির অভ্যন্তরীণ ফাটল। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইউরোপের দূরত্ব এখন আগের চেয়ে অনেক স্পষ্ট, কারণ ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো এ সংকটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কাক্সিক্ষত সমর্থন না দিয়ে মূলত পার্শ্বচরিত্রের ভূমিকা পালন করেছে। ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে, যা মেরামতের জন্য হয়তো দেশটিতে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। যুদ্ধের ময়দানে ইরানের দীর্ঘদিনের মিত্র রাশিয়া ও চীন সরাসরি পক্ষ নিলেও শেষ পর্যন্ত তারা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব হারিয়েছে। বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ এখন শিয়া ও সুন্নি বিভাজনের সমান্তরালে আবর্তিত হচ্ছে, যেখানে সুন্নি দেশগুলো পশ্চিমের দিকে এবং শিয়া বলয় রাশিয়া ও চীনের দিকে ঝুকে পড়েছে। এ যুদ্ধের আরেকটি বড় দিক হলো রুশ ও চীনা প্রযুক্তির প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ব্যর্থতা। ভেনেজুয়েলা এবং পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাতের পর ইরান যুদ্ধেও দেখা গেছে যে, আমেরিকার অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের সামনে এসব সরঞ্জাম কার্যকর সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এ ঘটনা বৈশ্বিক অস্ত্র বাজারে চীন ও রাশিয়ার ভাবমূর্তিকে বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে। তবে বিশ্লেষকদের একটা বড় অংশ মনে করছেন, ইরান আপাতত ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কৌশলগত জয় গেছে তেহরানের ঘরে। সমরাস্ত্রে তুলনামূলক পিছিয়ে থাকলেও একাই আমেরিকা-ইসরায়েলের সঙ্গে লড়ে বাহবা কুড়াচ্ছে তেহরান। এমনকি ইরানের এ লড়াই গোটা আধিপত্যবাদী বিশ্ব ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে। অনেকেই মনে করছে, এ যুদ্ধবিরতি আসলে মার্কিন প্রশাসনের এক ধরনের নৈতিক পরাজয়। -এশিয়া টাইমস