মানুষ জন্ম নিয়ে যেমন একদিন পৃথিবীতে আসে, তেমনি একদিন নিঃশব্দে বিদায় নেয়। এই বিদায়ের মুহূর্তে ইসলামের পক্ষ থেকে মৃত ব্যক্তির জন্য যে সর্বশেষ সম্মান ও কল্যাণ কামনার নীতিনির্ধারিত রয়েছে, এর নাম জানাজার নামাজ। এটি শুধু মৃতের জন্য একটি দোয়া নয়; বরং জীবিতদের জন্য এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসা, এক নীরব উপদেশ-যেখানে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব ও আখিরাতের চিরস্থায়িত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই নামাজ নীরবভাবে বলে দিচ্ছে আপনি মসজিদে যান অথবা নাই যান, মসজিদের খাটিয়া কিন্তু আপনার বাড়িতে একদিন চলে যাবে। অতএব আপনার জন্য জানাজার নামাজ পড়ার আগে আগে আপনি যথাযথভাবে নামাজ ধরবেন সেটা জানাজার নামাজের নীরব শিক্ষা। জানাজার নামাজ ইসলামে ফরজে কিফায়া। সমাজের কিছু মানুষ যদি এই দায়িত্ব আদায় করে, তবে সবার পক্ষ থেকে দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়। কিন্তু যদি কেউই জানাজার নামাজ আদায় না করে, তবে পুরো সমাজ গুনাহগার হবে। জীবিতদের ইমানি দায়িত্ব মৃত ব্যক্তির জন্য কাফন, দাফন ও জানাজার যথাযথ ব্যবস্থা করা। জানাজার নামাজ একজন মৃত ব্যক্তির জন্য একবার পড়াই নবীজি (সা.)-এর সুন্নত নিয়ম। জানাজার নামাজ একজন মানুষকে এই পৃথিবীতে চিরবিদায় এবং শেষ সম্মান জানানোর এক সুন্দর আদর্শ পদ্ধতি। ইসলামের এই অনুপম আদর্শ দেখে অনেক বিধর্মী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।
জানাজার নামাজের ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য : জানাজার নামাজ অন্যান্য নামাজের মতো নয়। এতে কোরআন তেলাওয়াত নেই, রুকু নেই, নেই সিজদার কোনো বিধান। নামাজ শব্দের আরবি হলো সালাত, এ শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়, একটি অর্থ হলো দোয়া, প্রার্থনা ও আল্লাহর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা। আর জানাজার মূল লক্ষ্য হলো দোয়া ও প্রার্থনা। এজন্য জানাজাকে সালাতে জানাজা বা জানাজার নামাজ বলে অভিহিত করা হয়। আসলে এটি নামাজ নয়। এটি মূলত দোয়া ও মৃত ব্যক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যখন তোমরা মৃতের জন্য জানাজা পড়বে, তখন তার জন্য আন্তরিকভাবে এবং খাঁটি মন দিয়ে দোয়া করো।’ (আবু দাউদ) এই নামাজ একদিকে মানবতার পরিচয়, অপরদিকে অপরিসীম ফজিলতের ইবাদত। জানাজার নামাজে অংশগ্রহণের ফজিলত এতটাই ব্যাপক যে রসুলুল্লাহ (সা.) তা উহুদ পাহাড়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি জানাজার নামাজ পড়ল, সে এক কিরাত সওয়াব পেল; আর যে দাফন পর্যন্ত উপস্থিত থাকল, সে দুই কিরাত সওয়াব পেল।’ সাহাবাগণ জানতে চাইলেন কিরাত এর অর্থ কী? তিনি বলেন, ‘এক কিরাত হলো উহুদ পাহাড়ের সমান সওয়াব’ (সহিহ মুসলিম)।
আরেক হাদিসে এসেছে, ‘কোনো মুসলমান যদি মৃত্যুবরণ করে আর তার জানাজায় শিরক পাপমুক্ত চল্লিশজন লোক উপস্থিত হয়, আল্লাহ তাদের আবেদন অবশ্যই কবুল করবেন’ (সহিহ মুসলিম)। এ থেকেই বোঝা যায়, জানাজার নামাজ মৃতের জন্য যেমন উপকারী, তেমনি জীবিতদের আমলনামা ভারী করার এক সুবর্ণ সুযোগ।
জানাজার নামাজের সংক্ষিপ্ত নিয়ম : পবিত্রতা অবলম্বন করে এই নামাজ আদায় করতে হয়। মৃত ব্যক্তির জন্য রহমত ও মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে চার তাকবিরে জানাজার নামাজ আদায় করার নিয়ত মনে মনে ধারণা করতে হবে। জানাজার নামাজ আদায় করতে হয় দাঁড়িয়ে, কিবলামুখী হয়ে। দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করা ফরজ। জানাজার নামাজের আরেকটি ফরজ হলো এই নামাজে চারবার তাকবির (আল্লাহু আকবার) বলতে হয়। প্রথম তাকবিরের পর সানা এবং দ্বিতীয় তাকবিরের পর দরুদ পড়তে হয়। তৃতীয় তাকবিরের পর মৃতের জন্য ক্ষমা, মুক্তি ও মর্যাদা বৃদ্ধির দোয়া অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে করতে হয়। চতুর্থ তাকবিরের পর সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করা হয়। এই কয়েকটি তাকবিরের মধ্যেই যেন লুকিয়ে থাকে জীবনের শেষ অধ্যায়ের সমস্ত আবেদন, জীবনের শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির বার্তা। জানাজার নামাজ মানুষকে নীরবে পরকালের শিক্ষা দেয়। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মানুষ বুঝে যায়। আজ যার জন্য দোয়া করছি, কাল আমাদের জন্যও কেউ দাঁড়াবে। কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে’ (সুরা আলে ইমরান- ১৮৫)।
জানাজার নামাজ অহংকার ভেঙে দেয়, দুনিয়ার মোহ ঝরিয়ে দেয় এবং মানুষকে আল্লাহমুখী করে তোলে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-ক্ষমতা, সম্পদ, পরিচয় সবই এখানে শেষ; সঙ্গে যাবে কেবল আমল আর মানুষের দোয়া। জানাজার নামাজ ইসলামের এক গভীর মানবিক শিক্ষা। এটি মৃতের অধিকার, আবার জীবিতের আত্মার আয়না। যে সমাজ জানাজার নামাজকে গুরুত্ব দেয়, সে সমাজ মৃত্যুকেও শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করতে জানে। তাই জানাজার নামাজকে অবহেলা নয়, বরং ইমানি দায়িত্ব ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করাই একজন সচেতন মুসলমানের পরিচয়।
লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা
বিডি প্রতিদিন/নাজমুল