Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ২৩:০৮

থাকল না তার কেউ

মির্জা মেহেদী তমাল

থাকল না তার কেউ

রংপুরের বাবুপাড়ার বাড়ি থেকে হঠাৎ নিখোঁজ হন আইনজীবী রথীশ চন্দ্র ভৌমিক বাবু সোনা। জাপানি নাগরিক হত্যা ও মাজারের খাদেম হত্যা মামলার পিপি বাবু সোনার নিখোঁজের খবরটি প্রকাশ করেন তার স্ত্রী স্নিগ্ধা ভৌমিক। এমন তথ্য পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নড়েচড়ে বসে। নিখোঁজ রথীশের সন্ধানে মাঠে নামে র‌্যাব, পুলিশ, পিবিআইসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা।

আইনজীবী রথীশের নিখোঁজের খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রংপুর। তার নিখোঁজ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন- কেউ বলছে বাবু সোনা আত্মগোপন করেছেন, কারও কারও মতে, তার প্রতিপক্ষ ডেকে নিয়ে গেছে। কারও ধারণা তাকে জেএমবি তুলে নিয়ে হত্যা করেছে। কেউ বলছে, তিনি দেশত্যাগ করেছেন। নানা মুখে নানা কথা। এর মধ্যেই রথীশের সন্ধানের দাবিতে আওয়ামী লীগ, আইনজীবী সমিতি, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন আন্দোলনে নামে। বিক্ষোভ সমাবেশে রথীশ নিখোঁজ ঘটনার জন্য জঙ্গি, জামায়াত-শিবির ও বিএনপিকে দায়ী করা হয়। রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক, জেলা প্রশাসক এনামুল হাবীব, পুলিশ সুপার মিজানুর রহমানসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা অ্যাড. রথীশের বাসায় ছুটে যান। দেন তাদের পরিবারকে সান্ত্ব্বনা। স্ত্রী স্নিগ্ধা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, আমি কোনো কথা শুনতে চাই না। আমি আমার স্বামীকে জীবিত ফেরত চাই। পুলিশ তদন্তে নামে। র‌্যাবও তাদের তদন্ত শুরু করে। তারা প্রথমেই পরকীয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে তদন্তে নামেন। এরপর পুলিশ বাবু সোনার স্ত্রী তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের  সহকারী শিক্ষিকা স্নিগ্ধা ভৌমিক ও তার প্রেমিক একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলামের মোবাইল ফোনের কললিস্ট বের করে। কললিস্ট দেখে আঁতকে ওঠে পুলিশ। প্রতিদিন প্রেমিক-প্রেমিকা জুটি ৩০ থেকে ৩৫ বার মোবাইলে কথা বলত। ওই কললিস্ট দেখে সন্দেহ হলে নগরীর রাধাবল্লভের বাড়ি থেকে প্রথমে গ্রেফতার করা হয় কামরুল ইসলামকে। তাকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। এরপর হত্যাকাণ্ডের তথ্য জানান কামরুল। র‌্যাব বাবুপাড়ার বাড়ি থেকে স্নিগ্ধা ভৌমিককে গ্রেফতার করে। তাদের দেওয়া তথ্য পেয়ে র‌্যাব সোয়া ১টার দিকে রথীশ চন্দ্র ভৌমিকের বাবুপাড়ার বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে মোল্লাপাড়ায় খাদেমুল ইসলাম জাফরীর নির্মাণাধীন বাড়ির মেঝে থেকে লাশটি উদ্ধার করে। নিখোঁজের পাঁচ দিন পর রংপুরের বিশেষ জজ আদালতের পিপি ও আওয়ামী লীগ নেতা রথীশ চন্দ্র ভৌমিক বাবু সোনার লাশ উদ্ধার করে র‌্যাব।

পুলিশ জানতে পারে, রংপুর তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ছিলেন রথীশ চন্দ্র ভৌমিক। ওই বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরি করতেন রথীশ চন্দ্রের স্ত্রী স্নিগ্ধা ভৌমিক ও কামরুল ইসলাম। দীর্ঘদিন ধরে তাদের মধ্যে পরকীয়ার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে রথীশের মাঝে মাঝে ঝগড়া হতো। পরকীয়ার কারণে অশান্তি ছিল পরিবারের মধ্যে। বিষয়টি নিয়ে অনেকবার ঘরোয়াভাবে বিচারও হয়। কিন্তু তারপরও পরকীয়া থেকে ফেরাতে পারেনি স্ত্রীকে। রথীশ চন্দ্রের এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে। বাড়িতে তেমন একটা লোকজন থাকত না। বাবু সোনাও বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে গভীর রাতে ফিরতেন।

র‌্যাবের জেরার মুখে স্নিগ্ধা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে মৃতদেহের অবস্থান জানান। স্নিগ্ধা ভৌমিক জানান, পারিবারিক কলহ, সন্দেহ ও অশান্তির কারণে তিনি পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে স্বামীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন এবং তাকে এ কাজে সহায়তা করেন তার কথিত প্রেমিক কামরুল মাস্টার। প্রাথমিক তদন্ত ও তার স্ত্রীর দেওয়া স্বীকারোক্তি মতে, দুই মাস আগেই তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। এরই অংশ হিসেবে চলতি বছরের ২৬ মার্চ রাতে তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বাবু সোনার স্ত্রী স্নিগ্ধা ভৌমিকের সহকর্মী ও পরকীয়া প্রেমিক কামরুল ইসলামের নির্দেশে মাত্র তিনশ টাকার বিনিময়ে তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র সবুজ ইসলাম ও রোকনুজ্জামান তাজহাট মোল্লাপাড়ায় নির্মাণাধীন ভবনের খোলা রুমের বালু খুঁড়ে রাখে। কামরুল মাস্টার তাদের শিক্ষক হওয়ায় তারা এ আদেশ পালন করে। এরপর ২৯ মার্চ রাত ১০টায় অ্যাড. বাবু সোনাকে ভাত ও দুধের সঙ্গে ১০টি ঘুমের বড়ি খাওয়ানো হয়। এরপর গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে স্নিগ্ধা ও কামরুল মিলে রথীশকে হত্যা করেন। হত্যার পর রাতে মৃতদেহ শয়নকক্ষেই রেখে দেন। ৩০ মার্চ ভোর ৫টায় আলমারিতে লাশ ঢুকিয়ে কৌশলে আলমারি পরিবর্তনের নাটক সাজিয়ে কামরুল বাড়ি থেকে বের হয়ে চলে যান। এরপর সকাল ৯টায় কামরুল ভ্যান নিয়ে আসেন। লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে নিহতের স্ত্রী তার প্রেমিকের সহায়তায় আলমারি পরিবর্তনের নামে ভ্যানে করে বাড়ির অদূরে তাজহাট মোল্লাপাড়ার সেই নির্মাণাধীন ভবনে নিয়ে যায়। যেখানে আগে থেকেই গর্ত করে রাখা হয়েছিল। পরে সেই গর্তেই লাশ পুঁতে ফেলেন তারা। এ ঘটনায় র‌্যাব হত্যাকারী স্নিগ্ধা ভৌমিক, তার প্রেমিক কামরুল ইসলাম, তাদের দুই ছাত্র সবুজ ইসলাম ও রোকনুজ্জামানকে গ্রেফতার করেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্নিগ্ধা আর তার প্রেমিক কামরুলসহ চারজনকে কারাগারে পাঠানো হয়। তাদের পরিকল্পনা ছিল বাবু সোনাকে হত্যার পর তারা সুখে-শান্তিতে একসঙ্গে থাকবেন। কিন্তু অনৈতিক সম্পর্কের এই পরিকল্পনা যে ভেস্তে যাবে, তারা তা কখনো বুঝতে পারেননি। স্নিগ্ধা স্বামীকে হত্যা করে স্বামী হারিয়েছেন। তার দুই সন্তান হারিয়েছেন তাদের বাবাকে। তার দুই সন্তানও তাকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে। কারাগারে আটক থাকা অবস্থায় তার প্রেমিক কামরুল আত্মহত্যার চেষ্টা করেন গলায় চাদর পেঁচিয়ে। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরকীয়ায় মজে থাকা স্নিগ্ধা এখন একা। তার আর কেউ রইল না।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর