Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ মার্চ, ২০১৯ ২৩:২৮

ব্যক্তিগত সমস্যার দাবি নিয়ে বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা

ক্রুদের জবানবন্দি

মুহাম্মদ সেলিম, চট্টগ্রাম

ব্যক্তিগত সমস্যার দাবি নিয়ে বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা

বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট ‘ময়ূরপঙ্খী’ উড্ডয়নের ২০ মিনিটের মধ্যেই ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেছেন পলাশ আহমেদ ওরফে মাহাদি ওরফে মাহিবি জাহান। ছিনতাই প্রচেষ্টার এক পর্যায়ে পলাশ ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। না হলে বিমানের যাত্রীদের ক্ষতি করার হুমকি দেন। ওই বিমানের দায়িত্বে থাকা পাইলট ও ক্রুদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এ তথ্য পায় মামলার তদন্তকারী সংস্থা চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। গত বুধবার তদন্তকারী সংস্থার অফিসে এসে ওই ঘটনার আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন বিমানের ক্রুরা।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক রাজেশ বড়–য়া বলেন, ‘ময়ূরপঙ্খী’র পাইলট, ফার্স্ট অফিসার ও চারজন কেবির ক্রুকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। একজন দেশের বাইরে রয়েছেন। তিনি দেশে এলে তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। যে পর্যন্ত যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে তাদের বক্তব্যে এ ঘটনার বিষয়ে কিছুটা ধারণা পাওয়া গেছে। সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তথ্য যাছাই-বাছাই শেষে এ ঘটনার বিষয়ে পুরোপুরি ধারণা পাওয়া যাবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত যতটুকু তথ্য পেয়েছি তাতে মনে হয়েছে শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে সমাধান করতে বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেছে পলাশ। এখনো পর্যন্ত তদন্তে এর বাইরে কোনো কারণ উঠে আসেনি।’

ঢাকা থেকে ১৪৮ জন যাত্রী নিয়ে উড্ডয়ন করে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট বিজি-১৪৭। এ ফ্লাইটের দায়িত্বে ছিলেন পাইলট, ফার্স্ট অফিসারসহ সাতজন ক্রু। ওই বিমানের দায়িত্বে থাকা সাতজনের মধ্যে ছয়জনই ময়ূরপঙ্খী ছিনতাই চেষ্টার ঘটনার জবানবন্দি দিয়েছেন মামলার তদন্তকারী সংস্থা চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটে। তারা হলেন ময়ূরপঙ্খীর পাইলট মো. গোলাম সাফি, ফার্স্ট অফিসার মুনতাসির মাহমুদ, কেবিন ক্রু শফিকা নাসিম নিম্মী, হোসনে আরা, শরীফা বেগম রুমা ও আবদুর শাকুর মুজাহিদ। ‘ময়ূরপঙ্খী’র চট্টগ্রাম হয়ে সংযুক্ত আবর আমিরাতের দুবাই যাওয়ার কথা ছিল। এ ফ্লাইটের ১৭-ডি নম্বর আসনটি বরাদ্দ ছিল পলাশ আহমেদের। ঢাকা থেকে বিমানটি উড্ডয়নের ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর পলাশ তার নির্ধারিত আসনটি পরিবর্তন করেন। তার আসন পরিবর্তনের বিষয়টি নজরে আসে বিমানের কেবিন ক্রু শফিকা নাসিমের। এ সময় পলাশকে নির্ধারিত আসনে বসিয়ে দেওয়ার জন্য আরেক কেবিন ক্রু হোসনে আরাকে নির্দেশ দেন। তখন হোসনে আরা নির্ধারিত সিটে বসার জন্য অনুরোধ করলে পলাশ উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। পলাশ হোসনে আরার মাথায় ‘পিস্তল’ ঠেকিয়ে ককপিটের দরজা খুলতে বলেন। তখন পাইলটের সঙ্গে কথা বলতে চান। একটি গোপন কোড ব্যবহার করে শফিকা নাসিম বিষয়টা পাইলট ও ফার্স্ট অফিসারকে অবহিত করেন। পাইলট লাইভ স্ক্রিন অন করে পলাশের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। এ সময় দেখতে পান পলাশের ডান হাতে পিস্তল ও বাম হাতে বিষ্ফোরক। সঙ্গে সঙ্গে তারা বিষয়টা শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কন্ট্রোল রুমকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করেন। তখন কৌশলের অংশ হিসেবে পাইলট ও ফার্স্ট অফিসার পলাশের সঙ্গে কথা বলেন। আলাপকালে পলাশ ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করা না হলে বিমানে ক্ষতি করার হুমকি দেন। তখন পাইলট ও ফার্স্ট অফিসার নানান আশ্বাস দিয়ে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। এ সময় পলাশকে ব্যস্ত রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয় কেবিন ক্রু শাহেদুজ্জামান সাগরকে। তাকে চা অথবা কফি খাওয়ার প্রস্তাব দিয়ে সময়ক্ষেপণ করা হয়। নির্ধারিত সময়ের ৭ মিনিট আগেই বিমানটিকে জরুরি অবতরণ এবং ফের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কেবিন ক্রু সাগরকে পলাশের জিম্মায় রেখে যাত্রীদের নামিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর নেমে যান পাইলট ও কেবিন ক্রু। পরে প্যারা কমান্ডো অভিযান চালায় বিমানে। যাতে নিহত হন বিমান ছিনতাই চেষ্টাকারী পলাশ। প্রসঙ্গত, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বিকালে ঢাকা থেকে উড্ডয়নের পর বিমানের ফ্লাইট ‘ময়ূরপঙ্খী’ ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে পলাশ আহমেদ। বিমানটি চট্টগ্রাম হয়ে দুবাই যাওয়ার কথা ছিল। বিমানটি ছিনতাইয়ের প্রচেষ্টার পর শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। পরে প্যারা কমান্ডো অভিযান চালিয়ে জিম্মিদশা থেকে বিমানটি মুক্ত করে। অভিযানেই নিহত হন ‘ময়ূরপঙ্খী’ ছিনতাই চেষ্টাকারী পলাশ আহমেদ। এ ঘটনায় শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সিভিল এভিয়েশন বিভাগের প্রযুক্তি সহকারী দেবব্রত সরকার বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। যাতে নিহত পলাশ আহমেদসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়। পরবর্তীতে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় কাউন্টার টেররিজম ইউনিটকে।


আপনার মন্তব্য