Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৬ মার্চ, ২০১৯ ২৩:০৫

অনলাইন বন্ধুত্বে সর্বনাশ

মির্জা মেহেদী তমাল

অনলাইন বন্ধুত্বে সর্বনাশ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্রী সুরভীর (ছদ্মনাম) সঙ্গে  মেসেঞ্জারে যুক্ত হওয়ার জন্য একটি রিকোয়েস্ট পাঠায় জনৈক সৌরভ। পাঁচ দিন পর রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করেন সুরভী। বাস্তব জীবনে অদেখা-অচেনা সেই সৌরভ ভার্চুয়াল পরিচয়ের সূত্র ধরেই সুরভীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসে। স্বাভাবিকভাবেই সুরভী তা নাকচ করে দিলে বন্ধু হিসেবে তার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার অনুরোধ জানায়  সৌরভ। সেই অনুরোধে রাজি হন সুরভী। বন্ধু হিসেবে সৌরভের সঙ্গে মেসেঞ্জারে নিয়মিত যোগাযোগ হতো সুরভীর। এরই এক পর্যায়ে সৌরভ জানায়, সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকে। কাজ করে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের (এআইজি) বন্ড ডিভিশনের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে। মেসেঞ্জারে কথোপকথনের সময় সুরভী সৌরভকে জানান, তিনি স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চান। এজন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তিনি। এ তথ্য জানার পর সৌরভ জানায়, সে সুরভীর জন্য নিজের প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা করতে পারে। সেই চাকরি পেলে সুরভী বছরে ৮৪ হাজার ডলার বেতনও পাবেন।

সৌরভ  তাকে জানায়, এআইজিতে কাজ পাওয়ার জন্য তাকে জব সার্টিফিকেট জোগাড় করতে হবে। একই সঙ্গে আইটি ট্রেনিংয়ের সনদও লাগবে। দেড় লাখ টাকা দিলে ডা. জুয়েল নামে এক বন্ধুর মাধ্যমে সৌরভ এসব সনদ জোগাড় করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয়। সেই অনুযায়ী একটি বিকাশ নম্বরে (০১৮২৮-২৩৯৭৫৯) প্রথমে ১০ হাজার টাকা পাঠান সুরভী। পরে গত বছরের ২৫ নভেম্বর এসএ পরিবহনের মাধ্যমে আরও ৫০ হাজার টাকা পাঠান তিনি। এ সময় অন্য একটি নম্বর (০১৬১৮-০৪৯৬২২) থেকে সুরভীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

৬০ হাজার টাকা দেওয়ার পর সুরভীকে সুইজারল্যান্ডের ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন থেকে আরেকটি সনদ জোগাড়ের কথা বলে সৌরভ। এজন্য আরও দেড় লাখ টাকা দাবি করা হয়। ২৭ নভেম্বর সবুজ নামে এক ব্যক্তি রাজধানীর ঝিগাতলায় এসে সুরভীর কাছ থেকে ওই টাকা নিয়ে যায়। সবুজের সঙ্গে সুরভীর যোগাযোগ হয় গুগল ডুও-র মাধ্যমে।

দেড় লাখ টাকা দেওয়ার পর সৌরভ তাকে জানায়, এআইজি কর্তৃপক্ষ সুরভীর চাকরির আবেদন গ্রহণ করেছে। এখন ওই প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপহার দিতে হবে। এজন্য এসএ পরিবহনের মাধ্যমে বেনাপোলে অবস্থানরত ভারতীয় এক বন্ধুর ঠিকানায় উপহার পাঠাতে বলে সৌরভ। ওই বন্ধু উপহার নিয়ে শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রে যাবে বলে সুরভীকে জানায় সৌরভ। তার কথা মতো সাড়ে ১১ হাজার টাকায় তিনটি ঘড়ি কিনে এসএ পরিবহনের মাধ্যমে বেনাপোলের ঠিকানায় পাঠান সুরভী।

স্কাইপি, মেসেঞ্জার ও টেলিফোনে যোগাযোগ করে সৌরভ পরবর্তী সময়ে সুরভীকে জানায়, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরি করতে হবে। সুরভী একটি সরকারি ও একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে স্টেটমেন্ট জোগাড় করে পাঠান। দ্রুত ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে সৌরভের কথা মতো আরও ১৫ হাজার টাকা দেন সুরভী। সব মিলিয়ে তিনি মোট তিন লাখ টাকা খরচ করেন সৌরভের নির্দেশনায়।

গত ২৮ ডিসেম্বর সৌরভ জানান, সুরভীর পাঠানো ব্যাংক স্টেটমেন্টে ভুল ধরা পড়েছে। এজন্য তার চাকরির আবেদন বাতিল হতে পারে। একই সঙ্গে সুরভীর চাকরির প্রস্তাবক হিসেবে সৌরভ ৭০ হাজার ডলার ডিপিএস করেছে বলেও জানায়। চাকরির আবেদন বাতিল হওয়ায় ডিপিএসের ওই অর্থ জব্দ করা হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করে সৌরভ। তেমন কিছু হলে সুরভীকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে বলেও হুমকি দেয় সে। এ ঘটনার পর ৩০ ডিসেম্বর থেকে সৌরভের সঙ্গে সুরভীর যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। সেদিন থেকে সৌরভের সব নম্বরও বন্ধ পাওয়া যায়।

ততক্ষণে সুরভী নিশ্চিত হয়, তার বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পেতে সৌরভ গাঢাকা দিয়েছে। সে মূলত প্রতারক চক্রের সদস্য। এরপর ১ জানুয়ারি হাজারীবাগ থানায় এ ঘটনায় জিডি করেন আঁখি।

সুরভীর বাবা ইরাকে একটি কোম্পানিতে ফোরম্যান হিসেবে কর্মরত। তার কষ্টের অর্থ খরচ করেই বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন সুরভী। এখন অর্থ ফেরত না পেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তিনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রতি দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। নইলে ওই চক্রের মাধ্যমে আরও অনেকে প্রতারিত হতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন সুরভী। সুরভী এ বিষয়ে হাজারীবাগ থানায় জিডি করেন। তবে কাউকে আটক করা যায়নি।

পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, সুরভীর সঙ্গে যে প্রক্রিয়ায় প্রতারণা হয়েছে, তা সাইবার ক্রাইমের আওতায় পড়ে। এর সঙ্গে জড়িত প্রতারকরা অত্যন্ত ধূর্ত ও পেশাদার প্রকৃতির হয়ে থাকে।


আপনার মন্তব্য

এই পাতার আরো খবর