Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২৩:২২

বদলে গেছে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার

মোস্তফা কাজল, কেরানীগঞ্জ থেকে ফিরে

বদলে গেছে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার

রাজধানীর উপকণ্ঠে কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। এই কারাগার আগে ছিল রাজধানীর নাজিম উদ্দিন রোডে। পুরনো সেই কারাগারের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি পরিসর এই কারাগারের। এখানে সাড়ে সাত হাজার বন্দীর জন্য রয়েছে প্রয়োজনীয় পরিবেশ। রয়েছে অধূমপায়ী,  বৃদ্ধ ও কিশোরদের জন্য পৃথক থাকার ব্যবস্থা।  গোসল ও খাবারের জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত পানি এবং সব সময়ের জন্য টয়লেট ব্যবহারের সুবিধা। এই কারাগারে বন্দীরা থাকছেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে। আয়তন ও বন্দী ধারণক্ষমতায় দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম এ কারাগারটি আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন কারাগার হিসেবেই তৈরি করেছে বর্তমান সরকার। বন্দীদের অধিক সুবিধা প্রদানের জন্য বিশাল এ কারাগারটি  তৈরিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কারা কর্তৃপক্ষ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিভিন্ন সময় নানা নির্দেশনা প্রদান করেছেন।

সরেজমিন চিত্র : স্বামীকে দেখতে গাজীপুর থেকে আসা ফাতেমা বেগম এ প্রতিবেদকের কাছে কেন্দ্রীয় কারাগারে টাকা লেনদেনের তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। শুধু ওই নারীই নন, অন্তত ২৫ থেকে ৩০ জন বন্দীকে দেখতে আসা স্বজনদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাদের প্রায় সবাই কমবেশি অভিযোগ করেন। কারাগারের মূল ফটক থেকে শুরু করে ভিতরে, মাঠে,  ঝোপঝাড়ের আড়ালে লোকজনের সঙ্গে কারারক্ষীদের কথা বলতে  দেখা গেছে। কারাগারের সামনের একটি শেডে একটি বেঞ্চে বসে সাক্ষাৎ প্রার্থীদের নাম-ঠিকানা লিখতে হয়। মূলত সেখান থেকেই বাণিজ্য শুরু। ধীরগতিতে নাম লেখানো চলে, পাশাপাশি চলতে থাকে দালালদের দেনদরবার। এ দরবার বেশি হয় সকাল ৮টার আগে এবং বিকাল ৫টার পরে। স্বজনদের মতে, বন্দীর সঙ্গে সাক্ষাৎ, হাসপাতালে থাকা, আসামির জামিন, বন্দী রোগী বাইরের হাসপাতালে পাঠানো, খাবার বা টাকা পাঠানো, মালামাল তল্লাশি করাসহ সবক্ষেত্রেই বাণিজ্য হয় কারাগারে। তারা বলেন, সাক্ষাৎকার কক্ষটি পাঁচজন কারারক্ষীর কাছে এক মাসের জন্য ৬০-৬৫ হাজার টাকায় ‘বিক্রি’ করা হয়। এরপর যা বাণিজ্য হয় তা ভাগ করে নেন কারারক্ষীরা। বর্তমানে এখানে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার বন্দী রয়েছেন। প্রতিদিন ১ হাজারের বেশি সাক্ষাৎ প্রার্থী আসেন। এদিকে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কারা কর্তৃপক্ষের সহায়তায় রসিদের মাধ্যমে কয়েদিদের জন্য পিসি করে টাকা পাঠানো হচ্ছে। কয়েদিদের মুঠোফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভিতরে দায়িত্বরত কারারক্ষীদের সহায়তায় মুঠোফোনে কথা বলেন বন্দীরা-  এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। জানতে চাইলে ঢাকা  কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল কবীর চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এখানে অনিয়ম বা বাণিজ্য নেই। বিশেষ করে মাদক বা সাক্ষাৎকার নিয়ে কোনো বাণিজ্য হচ্ছে না। উচ্চপর্যায়ের নজরদারি রয়েছে। তবে দু-একটি ঘটনা থাকতে পারে। কারা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ২৯ জুলাই  কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারের যাত্রা শুরু হয়। সপ্তাহের প্রতি কর্মদিবসে এখানে এক হাজারের বেশি স্বজন আসেন সাক্ষাৎ প্রার্থী হয়ে। টাকা দিয়ে কেন এ সুযোগ নেন?-হাজতি ও কয়েদিদের স্বজনরা বলেন, স্বজনকে একটু দেখলে ভালো লাগে। টিকিট কেটে দূর থেকে ছায়াও দেখা যায় না। কথাও বলা যায় না। কারা সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন কারাগারে সাজা ভোগ করা পুরনো কয়েদিদের মতে, বর্তমানে এটিই হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন আধুনিক কারাগার। তাদের মতে, কারাগারের ভিতরে প্রধানত বড় সমস্যা থাকার জায়গা, পায়খানা প্রস্রাব ও গোসল করা-  এসব সমস্যা এই কারাগারে একটুও নেই। কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার বলেন, নতুন এ কারাগারের করতোয়া নামের একটি ভবনে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বৃদ্ধ, কিশোর ও অধূমপায়ী বন্দীদের জন্য পৃথক সেল গঠন করা হয়েছে। শুধু কারাগারই নয়, আমরা চাই এটি হোক সংশোধনাগার। বৃদ্ধ এবং কিশোরদের মানসিক ও শারীরিক দিক বিবেচনা করে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভবনটির ২য় তলায় বয়সের ভারে ন্যুব্জ বা পঞ্চাষোর্ধ্ব বন্দীদের রাখা হয়েছে। ৩য় তলায় অধূমপায়ী বন্দীদের রাখা হয়েছে। ৪র্থ তলায় সাধারণ বন্দী আর ৫ম ও ষষ্ঠ তলায় কিশোর বা যুবক বন্দীদের রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরবর্তীকালে প্রয়োজনে অন্যান্য ভবনেও এ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। আগে ছোট, বড়, বৃদ্ধ বা যুবক সব শ্রেণির বন্দীকে এক কক্ষে একসঙ্গে রাখা হতো। বন্দীর জন্য আলাদা কক্ষের কোনো ব্যবস্থা রাখা হতো না।

এ ছাড়া বন্দীদের বিনোদনের জন্য কেস টেবিলের সামনে বিশাল একটি সাউন্ডবক্স আছে, বন্দীরা ইচ্ছামতো তাদের পছন্দের গান শুনতে পারছেন। এ ছাড়া এ কারাগারের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিতদের প্রতিটি বন্দীর সঙ্গে সুন্দর আচরণের নির্দেশ আছে। জেল সুপার জানান, কারাগার থেকে বের হয়ে সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবন গঠনের জন্য তারা নিয়মিত প্রণোদনা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। মূলত এ কারাগারটিকে আমরা একটি মডেল কারাগার হিসেবে গড়ার চেষ্টা করছি। কারাগারটির আয়তন ও বন্দীর তুলনায় সাক্ষাৎ কক্ষটি কম ধারণক্ষমতাসম্পন্ন। নতুন আরও কয়েকটি ভবন তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কারা সূত্র জানায়, নতুন এ কারাগারটিতে আটক বন্দীদের প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসার জন্য তৈরি করা এমআই ইউনিট নামে ৫০ শয্যার একটি হাসপাতাল রয়েছে। এ ছাড়া  কারাগার প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত বছর পর্যন্ত একই মেন্যু সকালের নাস্তা খাচ্ছিল কারাবন্দীরা। কারাবন্দীদের জন্য তৈরি হলো নতুন মেন্যু। বিগত ২০১৬ সালের ১৬ জুন থেকে মেন্যুতে যুক্ত হয়েছে মুখরোচক কিছু খাবার। জেলার এ বিষয়ে জানান, নতুন মেন্যুতে একই খাবার পাবেন কারাবন্দীরা। সপ্তাহে দুই দিন তারা পাবেন ভুনা খিচুড়ি ও মাংস, ৪ দিন সবজি-রুটি, বাকি একদিন হালুয়া-রুটি। কারা সূত্র জানায়, কারাগার প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত বছরের ১৫ জুন পর্যন্ত সকালের নাস্তায় একটি মেন্যু ছিল। মেন্যুটি হলো সকালের নাস্তায় একজন কয়েদি পেত ১৪.৫৮ গ্রাম গুড় এবং ১১৬.৬ গ্রাম আটা (সমপরিমাণ দুটি রুটি)। একই পরিমাণ গুড়ের সঙ্গে একজন হাজতি পেত ৮৭.৬৮ গ্রাম আটা (সমপরিমাণ দুটি রুটি)।


আপনার মন্তব্য