Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper

শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৬ অক্টোবর, ২০১৯ ২৩:৩২

তবুও লিফট কিনতে স্পেন যাচ্ছেন ৬ শিক্ষক

সফর বাতিল করলেন কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি

সৈয়দ নোমান, ময়মনসিংহ

তবুও লিফট কিনতে স্পেন যাচ্ছেন ৬ শিক্ষক

বাংলাদেশ প্রতিদিনে সংবাদ প্রকাশের পর অবশেষে ইউরোপ সফর বাতিল করলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. এ এইচ এম মুস্তাফিজুর রহমান। বিশ্ববিদ্যালয়ের লিফট কেনার কাজে চলতি মাসের ২০ থেকে ২৯ তারিখ পর্যন্ত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের টাকায় ‘ফাও’ সুইজারল্যান্ড ও স্পেন সফরের কথা ছিল ৯ সদস্যের একটি দলের। তবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে সেই তালিকায় থাকা ভিসি না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও থাকছেন ছয় শিক্ষক। কিন্তু তাদের লিফট নিয়ে কী ধরনের কারিগরি জ্ঞান আছে এমন প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। অন্যদিকে আরেক বোমা ফাটিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ও ত্রিশালের এমপি হাফেজ মাওলানা রুহুল আমিন মাদানী। তিনি বলেন, ‘ভিসি ও ইঞ্জিনিয়ার মো. হাফিজুর রহমান দুজনই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। ই-টেন্ডারের পাসওয়ার্ডও তাদের পছন্দসই ঠিকাদারদের কাছে থাকে।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে কী হয় না হয়, কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত আমরা অনেক সিন্ডিকেট সদস্যই জানি না। আমরা নামে মাত্র সিন্ডিকেট সদস্য। আর লিফটের জন্য এত লোক যাওয়ার কী প্রয়োজন তা আমার বোধগম্য নয়।’ এদিকে রেজিস্ট্রারের বক্তব্যের পর ফের তোলপাড় শুরু হয়েছে ক্যাম্পাসের ভিতরে-বাইরে। রেজিস্ট্রার ড. মো. হুমায়ুন কবির গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এ সফরের বিষয়টি প্রকল্প প্রস্তাবেই ছিল। ওই কোম্পানির কারখানা সুইজারল্যান্ডে। আর চালান হবে স্পেন থেকে। এ জন্যই আমরা ওই দুই দেশে যাচ্ছি।’ এ কমিটিতে এক্সপার্ট মেম্বার আছেন কি না- এমন প্রশ্নে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আমিন বলেন, ‘এক্সপার্ট মেম্বার ছাড়া যদি লিফট কিনতে যাওয়া হয়, তাহলে আসল উদ্দেশ্য অর্জন করা যাবে না।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, ‘ইউরোপ ভ্রমণ ছাড়া এ সফরের আর কোনো মাহাত্ম্য নেই। আর যদি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানই ইউরোপ যাত্রা বিনামূল্যে করিয়ে থাকে, তাহলে আগেই এর খরচ পকেটে তুলেছে ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিনিয়ার্স।’ ‘ফাও’ বিদেশ ভ্রমণের তালিকায় এখন রয়েছেন ট্রেজারার প্রফেসর মো. জালাল উদ্দিন, রেজিস্ট্রার ড. মো. হুমায়ুন কবির, প্রক্টর ড. উজ্জ্বল কুমার প্রধান, পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ইঞ্জিনিয়ার মো. হাফিজুর রহমান, সহকারী প্রধান ইঞ্জিনিয়ার মো. মাহবুবুল ইসলাম, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিংয়ের সহযোগী অধ্যাপক সোহেল রানা, কলা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো. শাহাবুদ্দিন ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. সুব্রত কুমার দে। এদের মধ্যে ছয়জনেরই নেই লিফট সম্পর্কে কোনো কারিগরি জ্ঞান। তবে ভিসার জন্য সুইজারল্যান্ড দূতাবাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে যে ৯ জনের অনাপত্তিপত্র দেওয়া হয়েছিল, সেখানে উপাচার্যের নামও ছিল। যদিও এখন আর তিনি যাচ্ছেন না বলে নিশ্চিত করেছেন। তবে বাকি আটজন যাচ্ছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। অনেকেই বলছেন, কলা অনুষদ অথবা ব্যবসায় অনুষদের শিক্ষকরা লিফট সম্পর্কে কী জ্ঞান রাখেন! ইউরোপ ভ্রমণ ছাড়া এ সফরের আর কোনো মাহাত্ম্য নেই। আর যদি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানই ইউরোপযাত্রা বিনামূল্যে করিয়ে থাকে, তাহলে আগেই এর খরচ পকেটে তুলেছে ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিনিয়ার্স। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, নির্মাণাধীন কয়েকটি বহুতল ভবনের জন্য ১৫টি লিফট কেনার দরপত্র পায় ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিনিয়ার্স। প্রত্যেকটি ১ হাজার ও ১ হাজর ২৫০ কেজির ধারণক্ষমতাসম্পন্ন। মোট খরচ পড়ছে প্রায় ১৩ কোটি টাকা। এগুলো কেনা হচ্ছে শিন্ডলার এলিভেটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। আর এটি সরবরাহ করছে মেসার্স ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড। প্রাক-চালান পরিদর্শন বা প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন হিসেবে এখন ছয় শিক্ষক ও দুই প্রকৌশলী ২০ থেকে ২৯ অক্টোবর সুইজারল্যান্ড ও স্পেন  সফর করবেন। এ সময় তাদের বিমানভাড়া থেকে যাবতীয় ব্যয় বহন করবে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি। এ নিয়ে শুক্রবার বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রথম পাতায় ‘লিফটের জন্য সুইজারল্যান্ড-স্পেন সফর’ শিরোনামে প্রতিবেদন ছাপা হয়। ওই দিনই বেসরকারি টিভি চ্যানেল নিউজ টোয়েন্টিফোরও নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিফট কা- নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে। এর পর থেকেই ওই সফরে থাকা সবাই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভাইরাল হয় খবরটি। ফেসবুক পেজে, নিজস্ব টাইমলাইনে কিংবা বিভিন্ন গ্রুপে হাস্যরস করে অনেকে শেয়ারও করেন। বড় হতে থাকে মন্তব্যের ঝুড়ি। এমন পরিস্থিতিতে নিজের ইউরোপযাত্রা বাতিল করেন ভিসি। বাংলাদেশ প্রতিদিনের ফেসবুক ভেরিফায়েড পেজে শামিমুল হক নামের একজন মন্তব্য করেছেন, ‘সফরের ব্যয় এখন লিফট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি বহন করলেও লিফটের দামে তা নিশ্চয়ই সমন্বয় করবে। এর অর্থ হলো, টাকাটা সরকার তথা জনগণের পকেট থেকেই যাচ্ছে।’ সানাউল করিম লিখেছেন, ‘সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের লাভ কী নয়জন লোককে ইউরোপে ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে। নিশ্চয়ই ডাল মে কুচ কালা হ্যায়।’ যে হারে সরকারি কর্মকর্তারা বিশ্ব ভ্রমণে বের হয়েছেন, তা ইবনে বতুতাকেও হার মানাবে। হরিলুট কত দিন চলবে প্রশ্ন রেখে তমাল আহমেদ টিপু নামের অপর একজন প্রতিবেদনটি শেয়ার করেছেন।


আপনার মন্তব্য