Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper

শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৬ অক্টোবর, ২০১৯ ২৩:৩৪

অপমৃত্যু নয়, খুন

মির্জা মেহেদী তমাল

অপমৃত্যু নয়, খুন

রংপুরের পীরগাছার অন্নদানগর রেল লাইনের সুকানপুকুর রেল ব্রিজের কাছে হাত-পা-মাথা বিচ্ছিন্ন কাটা-ছেঁড়া একটি মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। অপমৃত্যু বলে চালিয়ে দিলেও এটি মূলত একটি হত্যাকাণ্ড  ছিল। ঘটনার পাঁচ বছর পর সেপ্টেম্বরে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ২০১৪ সালের ৬ এপ্রিলের ঘটনা। রেললাইনের ওপর মৃতদেহের উপস্থিতি সবাইকে হতবাক করে। গ্রামের মানুষ রেল লাইনের ওপর এমন দুর্ঘটনা দেখতে মোটেই অভ্যস্ত নয়। অনভ্যস্ত ঘটনা দেখার জন্য উৎসুক লোকের জমায়েত বাড়তে থাকে। কেউ স্পষ্ট করে বলতে পারে না মৃতদেহটি কার বা কোথা থেকে এসেছিল। রেল ব্রিজ হতে ৮-১০ কি.মি. দূরে তাম্বলপুর বাজার। কাউনিয়া সান্তাহার রেললাইনটি এ বাজারটি স্পর্শ করে গিয়েছে। ২০১৪ সালে টি-২০ বিশ্বকাপ ক্রিকেট সারা বাংলাদেশকে মাতিয়েছে। তাম্বুলপুর-ই বা বাদ থাকবে কেন? কাছের সাধু সোনারায় গ্রামের আল আমিন নয়নের বাবা মো. রফিকুল ইসলাম স্থানীয় মুদি দোকানদার। ৬ এপ্রিল ছিল সম্ভবত বিশ্বকাপের শেষ দিন। বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় নয়ন মা-কে বলে বাজারের ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে খেলা দেখতে যায়। মোটামুটি ভালো ছাত্র হিসেবে পরিচিত সুদর্শন এ ছেলেটি গাইবান্ধা সরকারি কলেজের ইতিহাসের ৩য় বর্ষের ছাত্র। কলেজের ছুটি পেয়েই এক সপ্তাহ আগে বাড়িতে এসেছে। প্রতিদিন ক্রিকেট খেলা দেখে রাত ১০টার মধ্যে বাড়িতে ফেরে। সেদিনও ফেরার কথা। গ্রামে রাত নামে ঝুপ করে। ছেলেটি ফিরে না আসায় বাবা-মার উদ্বেগও বাড়ে ক্রমান্বয়ে। সময় গড়িয়ে যায়। পরদিন বেলা ১১টার সময় রেল দুর্ঘটনার কথা কানে আসায় উৎকণ্ঠিত বাবা তড়িঘড়ি করে ছোটেন সুকান পুকুর রেল ব্রিজের দিকে। রেল লাইনের ওপর দুর্ঘটনা। নিয়ম অনুযায়ী এসব দুর্ঘটনায় মৃতদেহের আইনি নিষ্পত্তি বর্তায় রেল পুলিশের ওপর। ততক্ষণে বোনারপাড়া রেল থানা থেকে পুলিশও এসে গেছে। মো. রফিকুল ইসলামের গগনভেদি আহাজারির মধ্যেই চলতে থাকে পুলিশের সুরতহাল (ইনকোয়েস্ট) প্রতিবেদন তৈরির কাজ। বাংলাদেশে কেউ যদি দুর্ঘটনায় মারা যায় তাহলে আপনজনেরা মৃতের আর ময়নাতদন্ত (পোস্টমর্টেম) করাতে চায় না। তারা মনে করে ডাক্তারদের এ কাটা-ছেঁড়া মুর্দার আত্মার শুধু কষ্টই বাড়ায়। সবার পরামর্শে ময়নাতদন্ত না করে পুত্রশোকে উদভ্রান্ত এক পিতা কাঁধে নিয়ে চললেন তার একমাত্র উত্তরাধিকারীকে। মধ্যবয়সী এ দম্পতির শোক দেখার আর কেউ নেই। সপ্তাহ না যেতেই একদিন হাওয়ায় গুঞ্জন শোনা যায় ফকির পাড়ার একটি মেয়ের সঙ্গে তার ছেলের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। প্রায় ২ কি.মি. দূরের এ ফকিররা ধনে-জনে-মানে বলীয়ান। শোকাতুর পিতা রফিকুলের মন মানে না- কেন তার বাধ্য ছেলেটি বাড়িতে না এসে উল্টো দিকের রেললাইনে এত দূরে চলে গেল! এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই একদিন সোজা চলে গেলেন ৬০ কি.মি. দূরের বোনারপাড়া রেল থানায়। কিন্তু ছেলের হাতের মোয়ার মতো চাইলেই তো থানায় মামলা করা যায় না- যেখানে সবাই জানে ঘটনাটি দুর্ঘটনা। একই কারণে গ্রামের কাউকে সঙ্গেও পেলেন না এ দুর্ভাগা পিতা। তিনি আদালতের স্মরণাপন্ন হলেন। আদালতের নির্দেশে খুনের মামলা হলো, কিন্তু মৃত দেহের তো ময়নাতদন্ত হয়নি। সুতরাং ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে লাশ উত্তোলন করে রংপুর মেডিকেল কলেজে পাঠাতে হলো। তারাও মতামত দিলেন- হ্যাঁ ছেলেটি রেল দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আর তো সংশয় নাই-তাই পুলিশ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়- ফাইনাল রিপোর্ট। নয়নকে কেউ খুন করেনি। সোজা বাংলায়-‘ঘটনার ভুল বোঝাবুঝি’। কিন্তু পিতা মো. রফিকুল ইসলাম মানলেন না, না-রাজি দিলেন আদালতে। পাক্কা আড়াই বছর আগের ঘটনা। পিবিআই রংপুর ইউনিট ইনচার্জ মো. শহিদুল্লাহ কাওছারের নেতৃত্বে টিম বসেছে মামলার ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণে। মৃতদেহের একটা ছবি ব্যতীত কোনো কিছুই কাজে লাগে না কারণ সবাই দুর্ঘটনার পক্ষে। ছবিটি বড় করে বিশ্লেষণ করতেই দেখা গেল বুকের বাম পার্শ্বে একটা চিকন গভীর ক্ষত। পিএম ও ইনকোয়েস্ট রিপোর্টে এ ক্ষত সম্পর্কে কোনো কিছু উল্লেখ নেই। রেল এক্সিডেন্টে তো এরকম ক্ষত থাকার কথা না। তদন্তকারী কর্মকর্তা খোঁজার চেষ্টা করেন সেই সময়ে কারা কারা ক্রিকেট খেলা দেখেছিল, কে কে নয়নের পাশে বসেছিল এবং সর্বশেষ তাকে কোথায় দেখা গিয়েছিল। দীর্ঘ সময়ের স্মৃতি হাতরিয়ে তারা যতটুকু তথ্য দেয় তার ভিত্তিতে নয়নের বন্ধু আশিকুর রহমান তুষারকে নিয়ে আসা হয়। তুষারের কথামতো নিয়ে আসা হয় জুয়েল মিয়াকে; সে ওই মেয়েটির বৈমাত্রেয় ভাই। জুয়েল মিয়া আদালতে স্বীকার করে- বিশ্বকাপের সেদিন ছিল চাঁদনী রাত। খেলা শেষে তুষার, আল আমিন নয়নকে বলে সেই মেয়েটি তৎক্ষণাৎ তাকে দেখা করতে বলেছে। বন্ধুর কথায় সরল বিশ্বাসে নয়ন, তুষারের সঙ্গেই মেয়েটির বাড়িতে যায়। উঠানে গিয়েই দেখে সেখানে তার অপেক্ষায় আছে মেয়েটির ভাই মুকুল মিয়াসহ, চাচাতো ও বৈমাত্রেয় ভাই জুয়েল, মনির এবং রাঙ্গা। মুকুল নয়নসহ সবাইকে মাঠে হাওয়া খাওয়ার জন্য প্রস্তাব দেয়। কিছু বুঝে উঠার আগেই তারা হাওয়া খাওয়ার জন্য নয়নকে নিয়ে রওনা হয়। সারা পথ মুকুল নয়নের হাত ধরে গল্প করে। তারা খোশ গল্প করে আর সামনে চলে। ফকিরপাড়ার পরই ধানখেত। ধানখেতের মধ্যে একটি কালভার্ট। কালভার্ট-ই ছিল নয়নের শেষ গন্তব্য। হঠাৎ মুকুল তার লুঙ্গীর মধ্য হতে একটি ছুরি বের করে নয়নের বুকের বাম পাশে হৃৎপি  বরাবর বসিয়ে দেয়। নয়ন মাটিতে পড়ে যায়। একজন মুখ চেপে ধরে অন্যরা পা ও হাত। চলতে থাকে এলোপাতাড়ি ছুরির আঘাত। কালভার্টের পাশেই লুকানো ছিল একটি বস্তা, কোদাল ও ভ্যানগাড়ি এবং দড়ি। খুনিরা মৃত্যু নিশ্চিত করার পর নয়নকে বস্তায় ঢুকিয়ে ভ্যান গাড়িতে উঠায়। কোদাল দিয়ে মাটির রক্ত পরিষ্কার করে কালভার্টের নিচে ফেলে দেয়- যেন ভাগের মা গঙ্গা সব পাপ মুছে নেবে। কিছু কচি ধান গাছ দিয়ে জায়গাটি ঢেকে দিয়ে খুনিরা নিজেরাই ভ্যান চালিয়ে চলে যায় ১০ কি.মি. দূরের সুকান পুকুর রেল ব্রিজের কাছে। অপেক্ষায় থাকে কখন ট্রেন আসবে। রাত তখন প্রায় পৌনে ১টা। নির্ধারিত সময়ে সান্তাহার হতে লালমনিরহাটগামী ট্রেনের শব্দ শুনেই বস্তা খুলে খুনিরা নয়নের নিথর শরীরটাকে শুইয়ে দেয় রেললাইনের ওপর। এ খুনিরাই পরদিন সকালে রেল ব্রিজে দুর্ঘটনার পক্ষে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিল। এ মৃত্যুর কয়েকদিন পর মেয়েটিকে সিলেটে নিয়ে এক প্রবাসীর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে ইউরোপে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ইতিহাসের ছাত্র আল আমিন নয়ন কোনো ইতিহাস সৃষ্টির জন্য নয়, শুধু হৃদয় দিয়ে ভালোবেসেছিল মেয়েটিকে। হতভাগ্য সেই বিদীর্ণ হৃৎপি ই খুনিদের ঠিকানায় পৌঁছাতে অন্ধকারে আলোর নিশানা ঠিক করে দেয়।


আপনার মন্তব্য