শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ অক্টোবর, ২০১৯ ২৩:৪৩

বইয়ের বস্তায় লাশ

সাখাওয়াত কাওসার

বইয়ের বস্তায় লাশ

‘মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থানায় পদ্মা নদীতে লাশ ডুবিয়ে দেই। এর আগে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে পূর্ব ধোলাইপাড়ে গলা টিপে পাপ্পুকে হত্যার পর বস্তায় লাশ ঢুকিয়ে ৫০ কেজি ওজনের বই দিয়ে দেই। পরে পিকআপে করে ওই বস্তা নিয়ে যাই লৌহজংয়ে।’ ঠিক এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন কুতুব উদ্দীন পাপ্পুর হত্যাকারী রাজু আহমেদ (২৭)।

গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম নিভানা খায়ের জেসির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে অপহরণের পর হত্যার আদ্যোপান্ত বর্ণনা করেছেন রাজু। যদিও পাপ্পুকে খুন করা হয়েছে এ বিষয়টি এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না তার গর্ভধারিণী মা রুনা পারভীন রুনু। তার বিশ্বাস খুব শিগগিরই ঘরে ফিরবে তার নাড়িছেঁড়া ধন। জানা গেছে, গত ৩ অক্টোবর অপহৃত হন পাপ্পু। এ ঘটনায় বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজির পর না পেয়ে গত ৮ অক্টোবর যাত্রাবাড়ী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তার মা রুনা পারভীন রুনু। তবে এই জিডির সূত্র ধরেই ক্লু-লেস মামলার রহস্য উন্মোচন করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এরই মধ্যে পাপ্পুর মোবাইল নম্বর দিয়ে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। ডিবি সিরিয়াস ক্রাইম অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাহমুদ আফরোজ লাকী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এটি একটি ‘ক্লু-লেস’ মামলা। ডিসি স্যার এবং আমার সার্বিক তদারকিতে এসি আশরাফউল্লাহর নেতৃত্বে টিমের সদস্যদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই গত ৮ অক্টোবর  হত্যাকারীকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। এরই মধ্যে সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া রাজুর তথ্যের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একই এলাকায় বসবাসের সুবাদে বয়সে ছোট হলেও রাজু দীর্ঘদিন ধরেই পাপ্পুর সঙ্গে চলাফেরা করত। পাপ্পুর কাছ থেকে বিভিন্ন সময় টাকা-পয়সা ধার নিত। এ কারণে মাঝেমধ্যেই পাপ্পু বিভিন্ন কাজে নির্দেশ দিত রাজুকে। তবে পাপ্পুর নির্দেশ দেওয়া এবং ধমক দেওয়া কখনো মন থেকে মেনে নিতে পারত না রাজু।  পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩ অক্টোবর বিকাল পৌনে ৬টার দিকে রাজু কবিরাজবাগ রোডের ৮৫ নম্বর চৌধুরী হাউজ-২ বাড়ির গোডাউনে ভিকটিম পাপ্পুকে সঙ্গে নিয়ে নিজেও মদ খান। এক পর্যায়ে পাপ্পুকে গলা টিপে হত্যা করে। পাপ্পুর লাশ ভাঙ্গাড়ির ওই গোডাউনে ফেলে রেখে রাত সাড়ে ১১টার দিকে ৫০ কেজি পুরাতন নিউজ পেপার ও বই এবং একটি বড় মাপের বস্তা কিনে নিয়ে আসে। বস্তায় লাশ ঢুকিয়ে লাশের চারদিকে বই এবং পুরাতন নিউজ পেপার দিয়ে পরদিন সকাল ৯টার দিকে তার এক সহযোগীর মাধ্যমে একটি পিকআপে করে লাশের বস্তাটি মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজংয়ের পদ্মা নদীতে নিয়ে যায়। পদ্মা রিসোর্ট থেকে ৫০০ গজ দক্ষিণ দিকে পদ্মার শাখা নদীর তীরে বস্তাটি নদীতে ডুবিয়ে দেয়। ট্রলারের মাঝি বস্তাতে কী? জানতে চাইলে রাজুর উত্তর ছিল, তিনি পল্লী বিদ্যুতে কাজ করেন। তার কাছে কয়েকটি পুরাতন ট্রান্সফরমার ছিল। চলমান পুলিশি অভিযানের কারণে ভয়ে এই ট্রান্সফরমারগুলো ফেলে দিচ্ছেন। ৫ অক্টোবর নিহত পাপ্পুর সিম থেকে তার ভাই পাভেলের মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে ২ কোটি টাকা মুক্তিপণ চেয়ে ফোন ও খুদে বার্তা দেওয়া হয়। দাবিকৃত টাকা থেকে কিছু টাকা দ্রুত পাঠানোর জন্য দুটি বিকাশ নম্বর দেয়। নইলে পাপ্পুকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। নিহত পাপ্পুর মা রুনা পারভীন রুনু বলেন, আমার পাপ্পুর কোনো শত্রু নেই। সে অবশ্যই ফিরে আসবে। রাজু কখনো পাপ্পুকে মারতে পারে না। ওরা তো এক সময় আমাদের দোকানের ভাড়াটে ছিল। ওর বয়স তো মাত্র ১৫। নিহত পাপ্পুর বাবা মৃত সিরাজুল ইসলাম। মা, তিন ভাই ও এক বোন নিয়ে নিজেদের ৩০১ নম্বর দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর ৫ তলা বাড়িতে বসবাস করে পাপ্পুর পরিবার। গ্রেফতার মো. রাজুর বাবা মৃত-ইউসুফ আলী ফরাজী এক সময় পুলিশে চাকরি করতেন। গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার সৈয়দ কাঠিতে। বর্তমানে দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর ৩০৫, শহীদ চান্দীর বাড়িতে বসবাস তাদের।


আপনার মন্তব্য