শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ নভেম্বর, ২০১৯ ২২:৫৭

পুলিশের চার্জশিটে গলদ!

তদন্তে গরমিল, কোথাও আসামি হয়ে ফেরারি জীবন, আরেক তদন্তে নিরপরাধ

মাহবুব মমতাজী

পুলিশের চার্জশিটে গলদ!

পুলিশের চার্জশিটে আসামি হয়ে তারা ফেরার জীবনযাপন করছে। পুলিশেরই আরেক বিভাগের তদন্তে একই ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। কিন্তু তত দিনে মামলা আদালতে বিচারাধীন। আদালতে যাওয়ার আগে ভুক্তভোগীরা সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতনদের কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি।

২০১৩ সালের ১২ নভেম্বর বিএনপির ডাকা হরতাল কর্মসূচিতে গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় পল্টন থানায় করা চারটি মামলার চার্জশিটে বিএনপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আবদুল মালেক মালু নামে এক ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়। এসব মামলায় গ্রেফতার হয়ে মালু ১৮ দিন জেলও খাটেন। মামলাগুলোর মধ্যে তিনটি মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে এবং একটি মহানগর ষষ্ঠ অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কাউকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে কোনো মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তার নাম চার্জশিট থেকে বাদ পড়ে যাবে এবং সে ক্ষেত্রে চার্জশিট হতে তার নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি ওই চার্জশিটে ব্যাখ্যা করা থাকবে। জামিনে মুক্ত হওয়ার পর মালু ২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে দেওয়া এক আবেদনে তাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ফাঁসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেন। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কাছেও সেই আবেদনের অনুলিপি দেওয়া হয়। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মালুর অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনারের (ডিসি) ওপর। তিনি তা               অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেন একই বিভাগের তৎকালীন অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিনকে (বর্তমানে তিনি সিলেট জেলার এসপি)। তিনি ২০১৫ সালের ২৫ মে তদন্ত প্রতিবেদন মতিঝিল বিভাগের ডিসির কাছে জমা দেন (স্মারক-১৫১৩/আর ও মতিঝিল)। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত লোকজনের সহিংসতার কারণে পল্টন থানার চারটি মামলা পর্যালোচনা করা হয়। মামলার তদন্তভার গ্রহণ করেন পল্টন থানার তৎকালীন এসআই শওকত আলী। তিনি তদন্ত শেষে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মোট চারটি চার্জশিট দাখিল করেন। কিন্তু চার্জশিটভুক্ত আসামি আবদুল মালেক মালু একজন সহজ-সরল ও নিরীহ মানুষ। তার বিষয়ে কোনো রকম তদন্ত ও রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই না করে অসদুদ্দেশ্যে আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে রাজনৈতিক মামলায় জড়িয়ে আসামি করা হয়। সম্পূর্ণ বিচার-বিবেচনাহীনভাবে মালুর বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। অথচ আবদুল মালেক মালু ডেমরার সারুলিয়া ইউনিয়ন যুবলীগের সহ-সভাপতি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় এমপি হাবিবুর রহমান মোল্লা ও সারুলিয়া ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি মো. দুলাল খান। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন এবং স্থানীয় এমপির প্রত্যয়নপত্র এই প্রতিবেদকের কাছে আছে। তদন্তে পল্টন থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোরশেদ আলম ও পরিদর্শক (তদন্ত) তোফায়েল আহমেদেরও গাফিলতি বেরিয়ে আসে। জানতে চাইলে আবদুল মালেক মালু বলেন, ‘পুলিশের পরের তদন্তে আমি নির্দোষ তা তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। আমার নামে ওই চারটি মামলায় চার্জ গঠন হয়েছে।’ মালুর বিরুদ্ধে করা ষড়যন্ত্রমূলক মামলা থেকে অব্যাহতি দিতে পুলিশ সদর দফতরে চিঠিও দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের (আইন-২ অধিশাখা) উপ-সচিব মমতাজ উদ্দিনের স্বাক্ষরিত ওই চিঠি আইজিপি বরাবর পাঠানো হয়। এর দুবছরও পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর গাজী মো. মিরাজ নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি আইনে মামলা করেন তার সাবেক স্ত্রী তাসনিম সুলতানা। মামলাটি তদন্ত করেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি-উত্তর) উত্তরা জোনাল টিমের এসআই সাইফুল আলম। চলতি বছরের গত ৩০ মে তিনি এ মামলার চার্জশিট দাখিল করেন। চার্জশিটে তিনি একটি পেনড্রাইভ, একটি মেমোরি কার্ড ও তিন কপি ছবি জব্দ দেখান। গত ২ মার্চ গুলশানের গ্রিন ডেল্টা নিকেতনের ডি ব্লকের ৮ নম্বর রোডের ৪৬ নম্বর বাড়ির দ্বিতীয় তলার বি-১ ফ্ল্যাট থেকে জব্দ করা হয়েছে বলে তার চার্জশিটে উল্লেখ আছে। গত শনিবার ওই বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখান থেকে এসআই সাইফুল আলম কোনো কিছু জব্দ করেননি। ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রশীদ এ প্রতিবেদককে বলেন, বি-১ ফ্ল্যাটের মালিক মুজিবুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। সেখানে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মুজিবুরের জয় ফিড মিলস লিমিটেডের একটি অফিস ছিল। এরপর থেকে সেটি তালাবদ্ধ। কিন্তু পুলিশের কেউ গত এক বছরে ওই ফ্ল্যাটে আসেনি এবং কোনো কিছু জব্দও করেনি। একই কথা বলেন বাসার দারোয়ান রুহুল আমিনও। আর চার্জশিটে সাক্ষী করা হয় আরেক দারোয়ান শাহজাহানকে। অথচ তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, ৮/৯ মাস আগে একজন পুলিশ পরিচয় দিয়ে তার নাম-ঠিকানা নিয়ে যায়। আর বলে, বাসায় কে কে থাকেন। কিন্তু কোনো কিছু জব্দের ঘটনা ঘটেনি। জানতে চাইলে এসআই সাইফুল আলম বলেন, অভিযুক্তরা এসব বিষয়ে কিছু স্বীকার করবে না। আমরা আমাদের আইনগত কার্যক্রম চালিয়ে গেছি। চার্জশিটে ভুয়া জব্দ উল্লেখ করায় গত ৯ সেপ্টেম্বর এ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পুলিশ সদর দফতরে অভিযোগ করেন গাজী মো. মিরাজ। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ অক্টোবর ডিএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার (পিওএম-পশ্চিম) সৈয়দ জিয়াউজ্জামানকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সৈয়দ জিয়াউজ্জামান জানান, তারা অভিযোগটি খতিয়ে দেখছেন। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক ড. মোমতাজ উদ্দিন আহমেদ মেহেদী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মামলার এজাহার থেকে পুলিশি তদন্ত সঠিকভাবে না হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না। পুলিশের গতানুগতিক এসব প্রক্রিয়ায় অনেক গলদ দেখা যায়। বিভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়ে অনেক নিরপরাধ ব্যক্তিকেও মামলার চার্জশিটে নাম দেওয়া হয়।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর