শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ২৩:২৪

এজাহার বদলে দেন ওসি

আরাফাত মুন্না

এজাহার বদলে দেন ওসি

রাজশাহী জেলার পুঠিয়ার শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম হত্যা মামলার এজাহার পরিবর্তনের প্রমাণ পেয়েছে এ ঘটনায় হাই কোর্টের নির্দেশে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি। কমিটি বলেছে, এক্ষেত্রে পুঠিয়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাকিল উদ্দিন আহমেদের অতিউৎসাহী ভূমিকা রয়েছে। প্রতিবেদনে জেলা পুলিশের তিনজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, পুঠিয়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ইন্সপেক্টরকে (তদন্ত) দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশসহ তিন দফা সুপারিশ করেছে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি। বাকি দুই সুপারিশ হচ্ছে- হত্যার শিকার নুরুল ইসলামের মেয়ে নিগার সুলতানার দায়ের করা এজাহারের কপিকে এজাহার হিসেবে রেকর্ড করতে নির্দেশনা প্রদান এবং থানায় এজাহার প্রাপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে রেকর্ডিং অফিসার এজাহারকারীকে সময় ও তারিখ উল্লেখ করে প্রাপ্তি স্বীকার দেওয়ার নির্দেশনা প্রদান। রাজশাহীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের করা তদন্ত প্রতিবেদনটি সম্প্রতি হাই কোর্টের রেজিস্ট্রার অফিসে পৌঁছায়। গতকাল বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চে এ বিষয়টি আদেশের জন্য ধার্য থাকলেও রাষ্ট্রপক্ষের সময় আবেদনে তা পিছিয়ে আগামী রবিবার নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজশাহীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের পাঠানো ওই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, এজাহার দায়েরের কারসাজির বিষয়ে পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভূমিকা রয়েছে বলে স্বাভাবিকভাবে প্রতীয়মান হয়। তার জবানবন্দি গ্রহণের সময় জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) মো. মাহমুদুল হাসান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মু. মতিউর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পুঠিয়া সার্কেল) মো. আবুল কালাম সাহিদ ও ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মহিনুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। ফলে এজাহার কারসাজির বিষয়ে তারাও দায় এড়াতে পারেন না। তা ছাড়া সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ গ্রহণ করেছেন মর্মে জবানবন্দি দিয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।

এ হত্যাকান্ডে ছয়জন আসামি জড়িত থাকতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে এজাহারে কেন অজ্ঞাতনামার কথা বলা হয়েছে, তা বোধগম্য নয় উল্লেখ করে বিচারিক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়- যেহেতু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হত্যার ঘটনা, সে ক্ষেত্রে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও স্বার্থসংশ্লিষ্টরা জড়িত থাকতে পারে মর্মে এজাহারকারী সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। সে ক্ষেত্রে অজ্ঞাতনামা উল্লেখ করে মামলা দায়েরের কোনো কারণ থাকতে পারে না। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অতিউৎসাহী ভূমিকা রয়েছে মর্মে দেখা যায়। ভিকটিম নুরুল ইসলামের পরিবার তার হত্যার বিচারের জন্য নিগার সুলতানার অভিযোগ মতে যদি এজাহার গ্রহণ করত, তবে দুই দিন পর পুনরায় একই অভিযোগে তার মায়ের মামলা করার আবশ্যকতা থাকত না। ভিকটিম নুরুল ইসলামের লাশ ১১ জুন সকাল ১০টায় পুলিশ উদ্ধার করার দীর্ঘ সময় পর রাত সাড়ে ১১টায় এজাহার নেওয়া হয়। এ বিলম্বের কোনো কারণ পাওয়া যায়নি। মামলার নথি অনুযায়ী, গত ২৪ এপ্রিল পুঠিয়া সড়ক পরিবহন মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে নুরুল ইসলাম ও আবদুর রহমান পটল সাধরণ সম্পাদক প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনে পটলকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এ ফল বাতিল চেয়ে নুরুল ইসলামসহ তিনজন রাজশাহী আদালতে মামলা করেন। এরপর গত ১০ জুন নিখোঁজ হন নুরুল ইসলাম। পরদিন ১১ জুন সকালে পুঠিয়ার কাঁঠালবাড়িয়া এলাকার ‘এসএস ব্রিকফিল্ড’ নামক ইটভাটা থেকে নুরুল ইসলামের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের মেয়ে নিগার সুলতানা ওইদিনই মূল হত্যাকারী হিসেবে আবদুর রহমান পটলসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে থানায় এজাহার দাখিল করেন। থানা সেই এজাহার রেখে দেয়। একই সঙ্গে সাদা কাগজে নিগার সুলতানার স্বাক্ষরও রেখে দেয় পুলিশ। আরও জানা গেছে, থানা থেকে কোনো তৎপরতা না দেখে নিহতের স্ত্রী সাজেদা বেগম গত ১৩ জুন পুঠিয়া উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা করেন। এ মামলায় আবদুুর রহমান পটলসহ ৬ জনকে আসামি করা হয়। এ মামলাকে এজাহার হিসেবে গণ্য করার নির্দেশনা চাওয়া হয়। এ সময় পুঠিয়া থানা থেকে নিগার সুলতানার স্বাক্ষর করা একটি এজাহার নিয়ে আসে থানা পুলিশ। তাতে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি দেখানো হয়। ওই এজাহারে সন্দেহজনক হিসেবে ৫ জনের নাম বলা হয়। এ এজাহারের বিষয়ে তখনই নিগার সুলতানা ও তার মা সাজেদা বেগম আপত্তি জানিয়ে বলেন, এ এজাহার তাদের নয়। পরে পুলিশের উচ্চ পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ দাখিল করে কোন ফল না পেয়ে হাই কোর্টে আসেন নিহত নুরুল ইসলামের পরিবার। গত ১৬ সেপ্টেম্বর হাই কোর্ট রাজশাহীর পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাকিল উদ্দিন আহমেদ বাপ্পির বিরুদ্ধে শ্রমিক নেতা নুরুল হত্যা মামলার এজাহার বদলে ফেলার অভিযোগের বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেয়।


আপনার মন্তব্য