কুখ্যাত ‘ব্ল্যাক ট্রায়াঙ্গেল’ থেকে আসা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড। রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে অপরাধী চক্রগুলো শক্তিশালী হচ্ছে, বাড়ছে চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, দখল-বেদখল ও পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণ যুদ্ধ। শঙ্কা হচ্ছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকতার কবীর চৌধুরী বলেন, ‘সম্প্রতি চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, অস্ত্রের মহড়াও তত বাড়বে। প্রতিবেশী দেশ থেকে অস্ত্র প্রবেশের ঝুঁকি এ সময়ে সবচেয়ে বেশি থাকে। দ্রুত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান জোরদার করা জরুরি।’
অন্যদিকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপকমিশনার আমিনুর রশিদ জানান, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সিএমপির একাধিক ইউনিট নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যে অস্ত্র উদ্ধারও হয়েছে এবং এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজনৈতিক স্থবিরতাকে পুঁজি করে আন্ডারওয়ার্ল্ডে শুরু হয়েছে ‘একক আধিপত্য’ প্রতিষ্ঠার লড়াই। প্রকাশ্যে এলোপাতাড়ি গুলি ও পাল্টা গুলিতে শুধু টার্গেট ব্যক্তি নয়, সাধারণ মানুষও আক্রান্ত হচ্ছেন। নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, ইট-বালু-সিমেন্ট সরবরাহ, ভূমিদখল, মাদক, জুট ও ইন্টারনেট ব্যবসা, ফুটপাত ও গাড়ি স্টেশন নিয়ন্ত্রণে অস্ত্রের ভয় দেখানো এখন নিয়মিত কৌশল। চট্টগ্রামে ব্যবহৃত অধিকাংশ অবৈধ অস্ত্রের প্রধান উৎস হলো বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা দুর্গম অঞ্চল, যা ‘ব্ল্যাক ট্রায়াঙ্গেল’ নামে পরিচিত। রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজার হয়ে অন্তত ১৫টি রুট দিয়ে এসব অস্ত্র দেশে প্রবেশ করছে। অস্ত্র পাচারে জড়িত রয়েছে মিয়ানমারভিত্তিক বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও পার্বত্য অঞ্চলের কিছু সশস্ত্র দল। মিয়ানমার ভিত্তিক গ্রুপগুলোর মধ্যে রয়েছে রাখাইনের একক আধিপত্য বিস্তারকারী রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি। এ ছাড়া রয়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সশস্ত্র পাঁচটি দল আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা), রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও), রোহিঙ্গা সশস্ত্র সন্ত্রাসী হালিমের নেতৃত্বাধীন হালিম গ্রুপ ও নবী হোসেন গ্রুপ। দেশি সশস্ত্র সংগঠনের মধ্যে রয়েছে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ), পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) অন্যতম।
উল্লেখ্য, প্রায় ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা নিয়ে গঠিত এই ‘ব্ল্যাক ট্রায়াঙ্গেল’ অঞ্চলটি বাংলাদেশের রাঙামাটি-বান্দরবান, ভারতের মিজোরাম এবং মিয়ানমারের চীন ও রাখাইন রাজ্যজুড়ে বিস্তৃত। দুর্গমতা ও জটিল ভূপ্রকৃতির কারণে এ অঞ্চলে কার্যকর সরকারি নজরদারি অত্যন্ত দুর্বল, যা অস্ত্র ও অপরাধ সিন্ডিকেটের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিণত হয়েছে।