ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল সাড়ে ৯টা। গতকাল ছুটির দিনের সকালে হাজারো শিশুর পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে রাজধানীর অভিজাত আবাসিক এলাকা বসুন্ধরা। কারও বয়স ৯ বছর, কারও আবার ১৫। সবার হাতে ‘ড্রয়িং বোর্ড’। বাবা-মায়ের হাত ধরে কেউ এসেছে উত্তরা থেকে, কেউ আবার মুন্সিগঞ্জ থেকে। সবার গন্তব্য আবাসিক এলাকার এন ব্লকে অবস্থিত বসুন্ধরা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ। সেখানেই আয়োজন করা হয়েছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ অভ্যুত্থানের ওপরে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। দেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত বৃহৎ এই ছবি আঁকা প্রতিযোগিতায় খুদে হাতের তুলির আঁচড়ে ক্যানভাসে ফুটে ওঠে বাংলাদেশের ইতিহাসের রক্তক্ষয়ী এ দুই সংগ্রামের দ্রোহ ও মুক্তির আলো।
দেশের সর্বাধুনিক এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস ও ইনডোর স্টেডিয়ামজুড়ে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হয় এ প্রতিযোগিতা। এতে অংশ নিতে অনলাইন ও অফলাইন মিলে নিবন্ধন করে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী। এ সময় শিশু ও অভিভাবকদের পদচারণে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো বসুন্ধরা এলাকা।
তিনটি ক্যাটাগরিতে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিযোগিতা। এর মধ্যে তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত ক্যাটাগরি-১, সপ্তম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ক্যাটাগরি-২ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে বিশেষ ক্যাটাগরি। তিন ক্যাটাগরিতে মোট ৩০ লাখ টাকার ১৪৩টি পুরস্কার দেওয়া হবে। আর্থিক পুরস্কারের সঙ্গে থাকবে ক্রেস্ট ও সনদপত্র। ক্যাটাগরি ১ ও ২-এ প্রথম পুরস্কার রাখা হয়েছে ৩ লাখ টাকা করে। এই দুই ক্যাটাগরিতে মোট পুরস্কার থাকবে ১৪২টি। এ ছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ১ লাখ টাকার পুরস্কার। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে ২৬ ডিসেম্বর।
ভোর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে অভিভাবকরা বসুন্ধরা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ প্রাঙ্গণে আসতে শুরু করেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়তে থাকে। অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের শ্রেণিভেদে সহায়তার জন্য স্বেচ্ছাসেবকদের প্ল্যাকার্ড হাতে বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তারা অংশগ্রহণকারীদের নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দিতে সহায়তা করেন। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের আনা-নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে বসুন্ধরার ভিতরে পরিবহনের ব্যবস্থা করে। অভিভাবকদের বসার সুব্যবস্থা করা হয়। ছিল পর্যাপ্ত গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার ও পানির ব্যবস্থা ছিল। বেলা ১২টায় প্রতিযোগিতা শেষে নাম ধরে ধরে অভিভাবকদের হাতে তুলে দেওয়া হয় প্রতিযোগী শিক্ষার্থীকে।
এ প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শিল্প অঙ্গনের বরেণ্য ব্যক্তিত্বরা। তাদের মধ্যে রয়েছেন- স্পেনের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দ্য ক্রস অব অফিসার অব দ্য অর্ডার অব কুইন ইসাবেলা-এর মতো বিরল সম্মানে ভূষিত শিল্পগুরু ছাপচিত্রের জাদুকর মনিরুল ইসলাম, এস এম সুলতান পদক বিজয়ী দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী অধ্যাপক আবদুর শাকুর শাহ, একুশে পদক জয়ী প্রথিতযশা শিল্পী অধ্যাপক ড. ফরিদা জামান, বিশিষ্ট অভিনেতা ও চিত্রশিল্পী আফজাল হোসেন ও প্রচ্ছদ শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী ধ্রুব এষ। জুরি সহযোগী হিসেবে একদল তরুণ শিল্পী।
প্রতিযোগিতার বিষয়ে বসুন্ধরা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে প্রিন্সিপাল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আনিছুর রহমান বলেন, শিশু-কিশোরদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের গৌরবময় ইতিহাস জানানো এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যেই এ আয়োজন। এই প্রতিযোগিতা বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান মহোদয়ের ব্যক্তিগত পরিকল্পনার অংশ। তিনি চান শৈশব থেকেই নতুন প্রজন্ম দেশপ্রেমে জাগ্রত হোক এবং আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের গড়ে তুলুক।
প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে বাবা-মায়ের হাত ধরে আসে নেভি এ্যাংকরেজ স্কুল এন্ড কলেজের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সামান্থা হক মম। শিশুর মা শাপলা আক্তার বলেন, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ ঘটাতে এমন আয়োজন খুবই সহায়ক ভূমিকা রাখবে। এখানে দারুণ একটা পরিবেশে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হলো। সারা দেশ থেকে অনেক শিক্ষার্থী এসেছে। সবাইকে দেখে বেশ উৎফুল্ল মনে হলো। আমার মেয়েও এখানে অংশ নিয়েছে। সেও খুবই খুশি। দারুণ উদ্যোগ, চমৎকার একটা আয়োজন। এমন আয়োজন প্রতি বছরই হলে অনেক ভালো হতো।
বসুন্ধরা স্পোর্টস সিটি ও বসুন্ধরা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মেজর (অব.) মহসিনুল করিম বলেন, ঢাকার বাইরে থেকেও অনেক প্রতিযোগী এসেছে। এত বড় আয়োজন অনেক সুশৃঙ্খলভাবে শেষ করতে পেরেছি। প্রচুর স্বেচ্ছাসেবী নিয়োজিত ছিল। প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য আলাদা স্বেচ্ছাসেবী ছিল। সব মিলে অনেক ভালো একটা আয়োজন সম্পন্ন করা গেছে।
তিনি বলেন, বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান মহোদয় এই স্কুলটিকে এশিয়ার মধ্যে সেরা স্কুল হিসেবে দেখতে চান। এজন্য সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ, শিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে বসুন্ধরা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এখানকার শিক্ষার্থীদের সাঁতার, গান, নাচ, চিত্রাঙ্কন, কারাতে, তায়কোয়ান্দো, ফুটবলসহ সব ধরনের সহশিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাংলার পাশাপাশি আরবি, ইংরেজি, ফ্রেন্স ও চীনা ভাষা শেখানো হবে। তিনি বলেন, ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থার সুনাম বিশ্বজুড়ে। আমরা স্কুল চালুর আগে এক বছর ফিনল্যান্ডের কারিকুলামের ওপর আমাদের শিক্ষক ও স্টাফদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। বিদেশ থেকে প্রশিক্ষক এনেছি। কারিকুলাম নিয়ে গবেষণার জন্য গবেষক নিয়োগ দিয়েছি। এখানকার বাচ্চারা জাতীয় শিক্ষাক্রমে পড়লেও শিক্ষার পদ্ধতি ও ধরন হবে আন্তর্জাতিক মানের।
জানা গেছে, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় সারা দেশ থেকে মোট রেজিস্ট্রেশন করে ৯ হাজার ৭০৮ জন শিক্ষার্থী। ১ ও ২ নম্বর ক্যাটাগরির বাইরে বিশেষ ক্যাটাগরিতে ৩১৫ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করে।