বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য জনশক্তি রপ্তানি অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বেসরকারি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমাহীন দুর্নীতি এবং অনিয়মের কারণে জনশক্তি রপ্তানি আজ হুমকির মুখে। আর এজন্যই দরকার জনশক্তি রপ্তানিতে সরকারের একক নিয়ন্ত্রণ।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বিদেশ যেতে বাংলাদেশি কর্মীদেরই সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ হয়। দুর্নীতিবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্য, ফিলিপাইনের কর্মীরা মধ্যপ্রাচ্যে বিনা খরচে কাজের অনুমতি বা ওয়ার্ক পারমিট পান। সে একই অনুমতিপত্র পেতে বাংলাদেশি কর্মীদের মাথাপিছু খরচ হয় ২ থেকে ৩ লাখ টাকা। এভাবে জনশক্তি রপ্তানিতে বিদেশ থেকে চাহিদাপত্র, যা ‘ভিসা কেনা’ নামে পরিচিত, সংগ্রহ করে দেশে তা প্রক্রিয়াকরণে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়ম হয়।
বিদেশে কাজের জন্য যাওয়া কর্মীদের কাছ থেকে মধ্যস্বত্বভোগী ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো যথেচ্ছ টাকা আদায় করছে। এর জন্য ভিসা কেনাবেচাকে দায়ী করেছেন জনশক্তি খাত সংশ্লিষ্টরা।
টিআইবির তথ্যানুযায়ী, বিদেশগামী ৯০ ভাগ পুরুষ কর্মী দুর্নীতির শিকার হন। ‘ভিসা কেনা’ বাবদ প্রতি বছর ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যায়। এ টাকার একটি অংশ পায় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেট। সরকার নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে ২ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত বেশি আদায় করে এজেন্সিগুলো। এ বাড়তি টাকা চাহিদাপত্র কিনতে যায় বলে এজেন্সিগুলো দাবি করে। প্রায় প্রতিটি চাহিদাপত্র কিনে আনেন জনশক্তি রপ্তানিকারকরা। তা দেশে এনে কর্মীদের কাছে বিক্রি করেন। গন্তব্য দেশ ও বাংলাদেশ দুই দেশের দালালরা এ কেনাবেচায় জড়িত। এতে বিদেশ যাওয়ার খরচ (অভিবাসন ব্যয়) সরকার নির্ধারিত সীমার চেয়ে তিন গুণ পর্যন্ত বেশি হয়। বিদেশ থেকে কর্মীর চাহিদাপত্র সংগ্রহ করে রিক্রুটিং এজেন্সি। এর বিপরীতে কর্মীরা ভিসা পান। ভিসা প্রক্রিয়াকরণে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি), ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে ছাড়পত্র সংগ্রহ, ফিঙ্গার প্রিন্ট দেওয়া, দূতাবাস থেকে ভিসা সত্যায়ন করতে হয়। এগুলো এজেন্সির মাধ্যমে করতে হয় এবং এর প্রতিটি ধাপে অনিয়ম হয় বলে অনুসন্ধানে দেখা যায়।
এজেন্সির কর্মকর্তারা জানান, সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে প্রবাসীকল্যাণ ভবনে ‘বই’প্রতি ২০ হাজার টাকা দিতে (পাসপোর্টকে বই বলা হয় এখানে)। মধ্যপ্রাচ্যে নারী কর্মীদের বিনা খরচে বিদেশ যাওয়ার কথা থাকলেও তাদের ‘বই’ থেকেও টাকা আদায় হয়। গত বছরে প্রায় ১০ লাখ কর্মী বিদেশে গেছেন। কর্মীপ্রতি ২০ হাজার টাকা হিসেবে ২ হাজার কোটি টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে।
এভাবেই ঘুষ এবং দুর্নীতির কারণে অভিবাসন ব্যয় বেড়ে যায় কয়েক গুণ। অভিবাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, এ তো গেল সরকার আর এজেন্সির উপরি আয়। কিন্তু এর বাইরেও টাকা গুনতে হয়, বিদেশে গমনেচ্ছুকদের। গবেষণায় দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে বিদেশে যেতে আগ্রহী ব্যক্তিদের যোগাযোগ হয় দালালদের মাধ্যমে। এসব দালাল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তারা মূলত বিদেশে কাজের সন্ধানে যেতে আগ্রহীদের তালাশ করে। তাদের নানারকম প্রলোভন দেখায়। দেয় মিথ্যা আশ্বাস। এ দালালদের মাধ্যমেই জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো খদ্দের সংগ্রহ করে। এ দালালরাও অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে বিদেশে যেতে আগ্রহীদের কাছ থেকে। দীর্ঘদিন ধরে মাঠে কাজ করার কারণে মানব পাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে এ দালালরা। এরা অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার প্রলোভন দেখায়। আর এ কারণেই অবৈধভাবে সমুদ্র পথে ইউরোপে যাওয়ার হার বাড়ছে। সমুদ্রপথে অবৈধ অভিবাসন দেশের অন্যতম বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো বৈধ প্রক্রিয়া ছাড়াই নিয়মিতভাবে এ পথে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন অভিবাসনেচ্ছুরা। এমনকি জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করেও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন অনেক বাংলাদেশি। সম্প্রতি ইতালিতে অভিবাসন প্রত্যাশায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে সাতজন ঠান্ডায় নৌকাতেই মারা গেছেন বলে খবর মিলেছে। অবৈধ অভিবাসনের প্রচেষ্টাকালে মারা যাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও বেশ কয়েকবার এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। মাঝেমাঝেই এ ধরনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে। এটা উদ্বেগজনক। এতে একদিকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রাণ বিপন্ন হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ সত্ত্বেও অবৈধ অভিবাসন রোধ করা যাচ্ছে না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পন্থায় বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন অভিবাসনপ্রত্যাশী বাংলাদেশি তরুণরা। মূলত দালাল ও পাচারকারীদের প্ররোচনা-প্রতারণায় ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের পথে পা বাড়াচ্ছেন তারা। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক কমিশনের (ইউএনএইচসিআর) তথ্যমতে, অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। অবৈধ অভিবাসনের ক্ষেত্রে ‘পুশ’ ও ‘পুল’ উভয় ফ্যাক্টরই কাজ করছে। দেশে চাকরিপ্রত্যাশীদের তুলনায় বাজার অনেক ছোট। তার ওপর চাকরিপ্রত্যাশীদের অনেকেই অদক্ষ কিংবা কম দক্ষ। এসব কারণে প্রতিযোগিতার বাজারে তারা জায়গা করে নিতে পারেন না। আবার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে শ্রমবাজারে বৈষম্য তো রয়েছেই। সামাজিক অস্থিরতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও জীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। এগুলো হলো পুশ ফ্যাক্টর। আর পুল ফ্যাক্টর হলো বিদেশে উচ্চ মজুরি, নিরাপদ জীবন, নাগরিক সুবিধা, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার হাতছানি। সব মিলিয়ে বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ অভিবাসন। অবৈধ অভিবাসনের সঙ্গে মানব পাচারের একটা সংযোগ আছে। একে তো অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আনার স্বপ্নে নিজেরাই মরিয়া হয়ে বাইরে যেতে চায়, আবার পাচার চক্রের প্রলোভনেও ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে প্রলুব্ধ হয়। দেশে অবৈধ অভিবাসন তথা মানব পাচার প্রতিরোধে শক্ত আইন রয়েছে। এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা দরকার। ২০১২ সালে আইনটি প্রণীত হলেও দুঃখজনকভাবে মানব পাচারবিষয়ক অপরাধের তদন্ত, মামলা পরিচালনা ও অপরাধীর দণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রগতি সামান্য। অনেক মামলা দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে আছে। এসব মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় গতি আনতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল দাবি করছে সংশ্লিষ্টরা।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সব দেশে জনশক্তি রপ্তানি সরাসরি সরকারের মাধ্যমে হলেই কেবল এ ধরনের দুর্নীতি এবং অনিয়ম বন্ধ হতে পারে। একজন অভিবাসনপ্রত্যাশী যে দেশেই যেতে চান না কেন, তাকে সরাসরি সরকারের মাধ্যমেই যেতে হবে। বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, সব দেশকে অনুরোধ করবে তারা যেন তাদের চাহিদাপত্র সরকারের কাছে পাঠায়। বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর একটি প্রধান কাজ হবে যে, তারা ওই দেশে কর্মসংস্থানের কি কি সুযোগ আছে তা নিয়মিতভাবে অনুসন্ধান চালাবে। এজন্য প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দিতে হবে। বিভিন্ন দেশ তাদের দূতাবাসের মাধ্যমে জনশক্তির চাহিদা জানাবে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রাপ্ত চাহিদার ভিত্তিতে যোগ্য ব্যক্তিদের তালিকা প্রণয়ন করবে এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবে। এ ক্ষেত্রে একজন অভিবাসীপ্রত্যাশী সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ফি দিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যেতে পারবে। এর ফলে যেমন অভিবাসন ব্যয় কমবে, তেমনি বন্ধ হবে জালিয়াতি ও প্রতারণা। বিদেশেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। ফলে বহু দেশ বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে আগ্রহী হবে।