১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর। পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন। ঈদের নামাজ শেষে সবাই যখন আনন্দ ভাগাভাগি করছিলেন, তখন পাক বাহিনী রাজাকারদের সহায়তায় সাদা পোশাকে শাহনগর নাথপাড়াসহ আশপাশের পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। তারা সাধারণ মানুষকে মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ দিতে বলে। কেউ যখন খোঁজ দিচ্ছে না তখন লুণ্ঠন ও নির্যাতন চালায়।
বেছে বেছে ১৭ পরিবারের ছাত্র ও যুবক বয়সি ৩০ জনকে স্থানীয় মনাইছড়ি খালের পাড়ে হাত-পা বেঁধে গুলি করে পাক বাহিনী। পরে তাদের মাটিচাপা দিয়ে হানাদার বাহিনী চলে যায়। কিছু সময় পর গ্রামবাসী সেখানে গেলে গুলিবিদ্ধ একজনকে জীবিত দেখতে পান। ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে গেলেও বাকি ২৯ জন শহীদ হন। এ বর্বর হত্যাকাণ্ডে শহীদ হন মো. জহুরুল ইসলাম, মো. ইউনুছ, মো. জমিল উদ্দিন, নুর মোহাম্মদ, মো. এয়াকুব, মো. নুরুল আলম, তোফায়েল আহম্মদ, রুহুল আমিন, ফয়েজ আহমেদ, জাগের আহমেদ, আবছার আহম্মদ, নুরুল ইসলাম, চিকন মিয়া, জহুর আহম্মদ, ইদ্রিস, সোলাইমান, রফিকুল আলম, বজল আহম্মদ, হিন্দুদের মধ্যে ক্ষেমেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য্য, রমেশ চন্দ্র নাথ, কৃষ্ণ হরি নাথ, শুধাংশু বিমল নাথ, হরিপদ নাথ, হরি লাল নাথ, বিপিন চন্দ্র নাথ, সুবেন্দ্র লাল নাথ, হরিধন নাথ, নগর বাঁশি নাথ ও গৌর হরি নাথ।
একই দিন ফটিকছড়ির সীমান্তবর্তী দুর্গম ইউনিয়ন কাঞ্চননগরে পাক বাহিনী চালায় আরেক হত্যাযজ্ঞ। এ গ্রামের তৎকালীন বিএ পাস যুবক হেদায়তুল ইসলাম চৌধুরী এবং অজ্ঞাত আরেক যুবককে রক্তছড়ি খালের পারে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। সেখান থেকে এসে পাক বাহিনী দক্ষিণ কাঞ্চননগরের গোমস্তা পুকুরপারে নিরীহ ৯ বাঙালিকে এক রশিতে বেঁধে ব্রাশফায়ার করলে সাতজন তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করেন। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান আহমেদ হোসেন ও বদিউল আলম। এখানে শহীদ হন নুরুল আলম, ভোলা, বানু হোসেন, ভোলা ওরফে ভোলাইয়্যা, জেবল হোসেন, ইসলাম ও কালা মিয়া।
আরও জানা গেছে, ফটিকছড়ির নানুপুর বিনাজুড়ি খাল, রোসাংগীরীর আজিমনগর, লেলাং, কাঞ্চননগর, নিউ দাঁতমারা চা বাগান, উদলিয়া চা বাগান, দাঁতমারা উল্টা ভিটা, হেয়াকো সওজ অফিসসহ বিভিন্ন স্থানে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা হয়েছে। এর মধ্যে লেলাং, কাঞ্চননগর ও নিউ দাঁতমারা চা বাগানের গণহত্যার স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ হলেও বাকিগুলো স্থানীয় প্রশাসনের অবহেলায় এখনো অবহেলিত ও অরক্ষিত।
ফটিকছড়িতে প্রায় এক ডজন বধ্যভূমি রয়েছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও অধিকাংশ বধ্যভূমি অবহেলিত ও অরক্ষিত। এগুলো সংরক্ষণে উপজেলা ও স্থানীয় প্রশাসনের অবহেলা রয়েছে বলে অভিযোগ মুক্তিযোদ্ধাদের।