চট্টগ্রামে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের মাত্র ৪৮ দশমিক ৩ শতাংশ ছাত্রীই সঠিকভাবে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসকে (এইচপিভি) রোগের জীবাণু হিসেবে শনাক্ত করেছেন। বিষয়টি নিয়ে অজানা ৫২ শতাংশ ছাত্রী। আবার এর মধ্যে মাত্র ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ ছাত্রীই এইচপিভি জীবাণুকে ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বড় একটি অংশ রোগটির ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত নয়। চট্টগ্রামের তিনটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ‘বাংলাদেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে জরায়ুরমুখের ক্যানসার স্ক্রিনিং এবং এইচপিভি টিকাকরণ সম্পর্কে ধারণা’ শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য জানা যায়। বাংলাদেশে বেসরকারি মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জরায়ুরমুখের ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের (সিআইএমসি) গাইনি অ্যান্ড অব্স বিভাগ এ গবেষণাটি পরিচালনা করে। গবেষণায় চট্টগ্রামের তিনটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের মোট ১৭৮ জন ছাত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সিআইএমসির গাইনি অ্যান্ড অব্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারজানা চৌধুরীর নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি করা হয় মেডিকেলের প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রীদের ওপর।
গবেষণায় বলা হয়, অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশ ছাত্রীর বয়স ছিল ২১ বছর (৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ), যাদের বেশির ভাগই দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী (৭৭ শতাংশ) এবং অবিবাহিত ছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ৮২ শতাংশ ছাত্রী জরায়ুরমুখের ক্যানসার সম্পর্কে শুনেছেন মূলত তাদের শিক্ষকদের কাছ থেকে- ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সংবাদ মাধ্যমে জেনেছেন ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ। মাত্র ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী এ রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত সব প্রধান লক্ষণ সম্পর্কে বলতে পেরেছেন। ৭৬ শতাংশ ছাত্রী জরায়ুরমুখের ক্যানসার প্রতিরোধের বিষয়ের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। মাত্র ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ মহিলা শিক্ষার্থী এইচপিভি টিকা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শুধু ৭ দশমিক ৯ শতাংশ স্ক্রিনিং করেছেন। স্ক্রিনিং না করার পেছনে কারণগুলোর মধ্যে আছে, সচেতনতার অভাব, তথ্যের স্বল্পতা এবং আর্থিক সামর্থ্যহীনতা।
চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ ডা. মুসলিম উদ্দিন সবুজ বলেন, রোগ, রোগের ধরন, প্রতিষেধক ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা দিনদিন পরিবর্তন এবং আপডেট হচ্ছে। আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থাকেও এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিতে হবে। এই এগিয়ে নিতে গবেষণাই মূল চাবিকাঠি। যুগোপযোগী গবেষণার মাধ্যমে আগামীর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নির্ধারণ করতেই আমাদের এ গবেষণার প্রয়াস।
সিআইএমসির গাইনি অ্যান্ড অব্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারজানা চৌধুরী বলেন, ‘জরায়ু মুখের ক্যানসার বাংলাদেশে নারীদের দ্বিতীয় প্রধান ক্যানসার। বিশ্বে এটি নারীদের চতুর্থ ক্যানসার। এ রোগে বিশ্বে প্রতি বছর ৬ লাখের বেশি মহিলা আক্রান্ত হয় এবং ৩ লাখের বেশি মহিলা মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশে প্রতি বছর রোগটিতে ৬ হাজারের বেশি নারীর মৃত্যু হয় এবং প্রতি বছর ১২ হাজারের বেশি নারী আক্রান্ত হয়। কিন্তু একটু সচেতন হলেই জরায়ুরমুখের ক্যানসার বা সারভাইকেল ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রতিরোধের ব্যবস্থা হিসেবে কিশোরী ও তরুণীদের জন্য দেশে এইচপিভি টিকাকরণ এবং ৩০ ঊর্ধ্ব মহিলাদের জন্য স্ক্রিনিং পদ্ধতি চালু আছে। এইচপিভি টিকাকরণ এবং স্ক্রিনিংয়ের মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার প্রাপ্যতা সত্ত্বেও, সচেতনতার অভাবে এ রোগটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।’
গবেষণার পর্যবেক্ষণে বলা হয়, মেডিকেল শিক্ষার্থীরা হলেন ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যকর্মী। তাদের নিয়ে মাঠ পর্যায়ে জরায়ুরমুখে ক্যানসার বা সারভাইকেল ক্যানসার নিয়ে সচেতনতামূলক স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। যা পরবর্তীতে কিশোরী ও তরুণীদের এইচপিভি টিকা দেওয়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করবে এবং ৩০ ঊর্ধ্ব মহিলাদের স্ক্রিনিং এর আওতায় আনতে সাহায্য করবে। তাই আশা করা যায়, মেডিকেল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্কিত এ কর্মসূচিগুলো জরায়ুরমুখের ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়ক হবে।