চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে সবচেয়ে দুর্বল দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। বরাদ্দের দিক থেকে তৃতীয় বৃহত্তম মন্ত্রণালয় হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে এ মন্ত্রণালয়, যা সামগ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রমকে শ্লথ করছে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে মোট ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এডিপির মধ্যে জুলাই-নভেম্বর সময়ে বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এই নিম্ন বাস্তবায়নে বড় ভূমিকা রেখেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্বল অগ্রগতি।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় চলতি অর্থবছরে ১ লাখ ২২ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে, যা মোট এডিপির ৫ দশমিক ১৬ শতাংশ। তবে অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে তারা ব্যয় করতে পেরেছে মাত্র ৩ দশমিক ০৯ শতাংশ বা ৩৭৮ কোটি টাকা। এই ব্যয়ের বেশির ভাগই স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের আওতাভুক্ত প্রকল্পে।
আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-নভেম্বর সময়ে সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থা মিলিয়ে মোট ব্যয় হয়েছে ২৮ হাজার ৪৪ কোটি টাকা, যা এডিপির ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে গত অর্থবছরের একই সময়ে এই হার ছিল ১২ দশমিক ২৯ শতাংশ, তার আগের বছর ১৭ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ১৮ দশমিক ৪১ শতাংশ। এই ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে এসেছে ১৫ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা (১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ), প্রকল্প সহায়তা থেকে ১০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা (১২ দশমিক ৫৫ শতাংশ) এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ১ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা (১৮ দশমিক ৮১ শতাংশ)।
আইএমইডির কর্মকর্তারা জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি রেলপথ মন্ত্রণালয়, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগসহ একাধিক বড় মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দুর্বল বাস্তবায়ন সামগ্রিক এডিপি অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এডিপি বরাদ্দের দিক থেকে অষ্টম বৃহত্তম রেলপথ মন্ত্রণালয় জুলাই-নভেম্বর সময়ে ব্যয় করেছে মাত্র ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ। সড়ক ও জনপথ বিভাগ ব্যয় করেছে ৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ, বিদ্যুৎ বিভাগ ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
অন্যদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং কৃষি মন্ত্রণালয় তুলনামূলকভাবে ভালো দক্ষতা দেখিয়েছে।
আইএমইডি কর্মকর্তারা মনে করছেন, সরকারের চলমান কৃচ্ছ্রসাধন নীতি এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে বড় অবকাঠামো ও সামাজিক খাতের প্রকল্পগুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেন, এডিপি বাস্তবায়নের এমন ধীরগতি অব্যাহত থাকলে সরকারি বিনিয়োগ কমবে, যার প্রভাব পড়বে বেসরকারি বিনিয়োগের ওপরও। ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চলতি অর্থবছরে সরকার ১ হাজার ১৯৮টির বেশি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মোট ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন দিয়েছে। তবে বরাদ্দের শীর্ষে থেকেও ব্যয়ে তলানিতে থাকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই দুর্বল বাস্তবায়ন নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।