টানা প্রায় সাত মাস অনুসন্ধান শেষে প্রস্তুত করা হয়েছে আওয়ামী সরকারের আমলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে শ্বেতপত্র। এতে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির চিত্র পাওয়া গেছে। শিগগিরই ৩ হাজারের বেশি পৃষ্ঠার শ্বেতপত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। প্রাথমিকভাবে ইংরেজি ভাষায় তৈরি করে প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শ্বেতপত্রটি বাংলায়ও করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এখন বাংলা ভাষায় শ্বেতপত্রটি তৈরির কাজ চলছে। প্রযুক্তির উন্নয়নের কথা বলে ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ প্রকল্পের নামে যে ঢাকঢোল পিটিয়েছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকার, সেটি ছিল মূলত অর্থ পাচারের প্রকল্প। শ্বেতপত্রে বলা হয়, এ প্রকল্প ছিল ‘রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব’। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ (বর্তমান নাম বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১) প্রকল্প অনুমোদনেই দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। অতিরিক্ত ব্যয়, অস্পষ্ট ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে বহু প্রশ্ন থাকলেও সেগুলো উপেক্ষা করা হয়। অডিট আপত্তিও নিষ্পত্তি করা হয়নি। টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে আইসিটি খাতে প্রকল্পের নামে পরিকল্পিত অপচয়, একই কোম্পানিকে বারবার কাজ দেওয়া, প্রশিক্ষণের নামে রাষ্ট্রের অর্থ লোপাট ও এ-টু আই প্রকল্পে ভ্যালু ফর মানি পর্যালোচনা না করে আইসিটি খাতকে প্রকল্পভিত্তিক অর্থ বিতরণে একটি রাজনৈতিক ইকো সিস্টেমে পরিণত করা হয়। অন্যদিকে, টেলিকম খাতে এসওএফ (সোশ্যাল অবলিগেশন ফান্ড) থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা লোপাট, টেলিকম লাইসেন্সের নীতিতে সাধারণ মানুষের জন্য এক নিয়ম এবং আওয়ামী ঘনিষ্ঠদের জন্য ছিল আরেক (ভিআইপি) নিয়ম, পছন্দের প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হয় হাজার কোটি টাকার জাতীয় ফাইবার নেটওয়ার্ক। একই সঙ্গে বিটিসিএল ও টেলিটককে করা হয় ভঙ্গুর।
শ্বেতপত্র প্রসঙ্গে টেলিকম খাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘শ্বেতপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এটা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। এখন বাংলা ভাষায় শ্বেতপত্রটি তৈরি করা হচ্ছে। এর আগে এটি ইংরেজি ভাষায় তৈরি করা হয়।’ দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি জানান, আওয়ামী সরকারের আমলে টেলিকম সেক্টরকে বানানো হয়েছিল দুর্নীতির আখড়া। যাচাইবাছাই ছাড়া কোটি কোটি টাকার প্রকল্প ছাড় দেওয়া হয়েছে। শ্বেতপত্র প্রকাশ পেলে জাতির সামনে এসব বিষয় উঠে আসবে। একই প্রসঙ্গে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শ্বেতপত্র তৈরি কমিটি সিলগালা আকারে আমার কাছে দিয়েছে। শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে এটা প্রকাশ করা হবে। কমিটির সদস্যরা নিরলস পরিশ্রম করে বিগত সরকারের অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেছেন। এতে হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, শ্বেতপত্রে উঠে এসেছে, ‘ডিজিটালাইজেশনের নামে কীভাবে ধ্বংস করা হয়েছে নীতি, শাসনব্যবস্থা ও জনস্বার্থ।’ শুধু তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের ৬৫০ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্রে অনিয়ম, পরিকল্পিত পদ্ধতিগত অপচয় আর দুর্নীতির প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। এতে ডিজিটাল কানেকটিভিটি, হাইটেক পার্ক, এ-টু আই, প্রশিক্ষণ প্রকল্প সবখানেই কেস স্টাডিভিত্তিক দুর্নীতির চিত্র উঠে আসে। এতে দেখানো হয়েছে, আওয়ামী সরকারের সময় আইসিটি খাতের প্রায় সব প্রকল্পেই ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করা হতো। একই কোম্পানি বারবার ভিন্ন নামে টেন্ডার পেত। প্রশিক্ষণের নামে কোটি কোটি টাকা গেছে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে। হাইটেক পার্কে জমি বরাদ্দ ও নির্মাণ ব্যয়ে ক্ষমতাসীনদের দৌরাত্ম্য ছিল লাগামহীন। এ-টু আই প্রকল্পে ভ্যালু ফর মানি পর্যালোচনা করা হয়নি কখনোই। অন্যদিকে টেলিকম খাত নিয়ে প্রস্তুতকৃত আড়াই হাজার পৃষ্ঠার শ্বেতপত্রটি আরও বিস্ফোরক। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ৪২টি প্রকল্প পর্যালোচনা করে দেখানো হয়েছে, প্রায় অর্ধেক প্রকল্পেই গুরুতর অনিয়ম, অদক্ষতা ও স্বার্থসংঘাতের দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় সোশ্যাল অবলিগেশন ফান্ড (এসওএফ)। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী ইন্টারনেট নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হলেও এর মধ্যে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ৭টি প্রকল্প অনুমোদনে চরম অনিয়ম পাওয়া গেছে। প্রকল্প অনুমোদনের মানদণ্ড না মানা, অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া, প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই না করা, এসব অভিযোগ শ্বেতপত্রে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে। টেলিকম খাত পর্যালোচনাকারী কমিটির মন্তব্য, ‘এসওএফ ফান্ড কার্যত রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের হাতে চলে গিয়েছিল।’ শ্বেতপত্রে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা পুরো খাতের নীতি ও শাসনব্যবস্থার ভয়াবহ ভাঙনকে স্পষ্ট করে। নথিতে বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি কোম্পানি লাইসেন্স পেয়েছে অস্বাভাবিক দ্রুত সময়ে। অথচ একই শর্তে থাকা অন্যান্য আবেদনকারীকে বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। একাধিক ক্ষেত্রে নীতিমালা উপেক্ষা করে নিয়মবহির্ভূতভাবে লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে। এমনকি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী উদ্যোক্তাদের সুবিধা দিতে বিশেষ শর্তও বাতিল করে দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রের হাজার কোটি টাকার সম্পদ জাতীয় ফাইবার নেটওয়ার্ককে বেসরকারি কোম্পানির আধিপত্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জাতীয় নেটওয়ার্ক-নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এই প্রেক্ষাপটে সামিট কমিউনিকেশনস ও ফাইবার অ্যাটহোম নামে দুটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে বাজার দখলদারিত্ব, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর প্রভাব এবং নীতিভিত্তিক অসমতা তৈরি করেছে সে তথ্যও উঠে এসেছে এতে। শ্বেতপত্রে বিটিআরসির বিষয়ে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি বছরের পর বছর ধরে অনিয়মিত নিয়োগ, যোগ্যতা-অযোগ্যতার ইচ্ছাকৃত ব্যতিক্রম এবং নিয়ম পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরির সংস্কৃতি গড়ে তোলে। কমিটির ভাষায়, ‘বিটিআরসি নিজেই নিয়ম ভাঙার সংস্কৃতি’ তৈরি করেছে।