মিরপুর-১২ নম্বর সেকশনের গৃহিণী আশরাফী সিদ্দিকা গতকাল সকালের নাশতা বানাতে গিয়ে অটো চুলা জ্বালাতেই দেখেন তা জ্বলছে না। কয়েকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে আশপাশে খোঁজ নিয়ে দেখেন প্রতিবেশীদেরও একই অবস্থা। কারও চুলাতেই আগুন জ্বলছে না। এত দিন গ্যাস সংকটে নিভু নিভু হলেও চুলায় আগুন জ্বলেছে কিন্তু গতকাল তাও জ্বলেনি। সকালে পাউরুটি কলা দিয়ে নাশতা সারলেও দুপুরের খাবারের জন্য অনলাইনে খাবার ডেলেভারি অ্যাপ ফুডপান্ডাতে গিয়ে দেখেন হাতে গোনা কিছু দোকান থেকে খাবার নেওয়ার সুযোগ আছে। এলপি সিলিন্ডারের সংকটে অনেক হোটেল রেস্টুরেন্টেও খাবার রান্না করা যাচ্ছে না।
শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা আবদুল মোতালেব গিয়েছিলেন ঘরের কাছে ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দোকানে ইনডাকশন চুলা কিনতে। গত কয়েক দিন ধরে গ্যাসের সংকটে তার বাসায় রান্নাসহ প্রয়োজনীয় কাজ করতে খুব সমস্যা হচ্ছে। খাবার পানি বাইরে থেকে কিনে খেলেও বাসায় বয়স্ক বাবা-মা ও সন্তানদের জন্য গরম পানির ব্যবস্থা করার জন্য তিনি বাধ্য হন বৈদ্যুতিক চুলা কিনতে। কিন্তু বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় কয়েক দোকানে ঘুরেও কাক্সিক্ষত বৈদ্যুতিক চুলা না পেয়ে গুলিস্তানের উদ্দেশে রওনা দেন।
এর আগে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ গত বৃহস্পতিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানান, তুরাগ নদের তলদেশে গ্যাসের পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তা মেরামত করতে গেলে এতে পানি প্রবেশ করে। এ দুর্ঘটনায় ঢাকায় সরবরাহ কম থাকায় গ্যাসের মারাত্মক স্বল্পচাপ বিরাজ করে। এটি মেরামতের চেষ্টার মধ্যেই গতকাল সকালে আরেকটি দুর্ঘটনার কথা জানায় তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। মিরপুর রোডে গণভবনের সামনে চার ইঞ্চি ব্যাসের ভালভটি ফেটে লিকেজ তৈরি হয়। এটি মেরামতের জন্য বিতরণ নেটওয়ার্কের বেশ কয়েকটি ভালভ বন্ধ করে চাপ সীমিত রাখা হয়। যার ফলে ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, নিউমার্কেট, হাজারীবাগ ও গাবতলীসহ সংলগ্ন এলাকার সকাল থেকে গ্যাসের মারাত্মক স্বল্পচাপ বিরাজ করছিল। তবে বিকালে ক্ষতিগ্রস্ত ভালভটি নতুন ভালভ দ্বারা প্রতিস্থাপন করে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা হয় বলে দাবি তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের। বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম জানান, আমিনবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইন ঠিক করতে কয়েক দিন সময় লাগবে। পাইপলাইনেও কিছু সমস্যা আছে। কিছু জায়গায় নেটওয়ার্কেও সমস্যা থাকতে পারে। আর শীতকালে তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় অন্য সময়ের তুলনায় গ্যাস সরবরাহে এমনিতেই সমস্যা হয়। অন্য খাতগুলো গ্যাস সরবরাহ ঠিক থাকলেও আবাসিকে কিছুটা সমস্যা আছে। আবাসিকে এত বেশি অবৈধ সংযোগ যে বৈধ গ্রাহকদের এজন্য ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ, সার ও শিল্প সব খাতের কথা চিন্তা করেই আমাদের গ্যাস সরবরাহ করতে হবে। তীব্র গ্যাস সংকট বিষয়ে জানতে চাইলে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির অপারেশন ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, আমাদের এখন পরিমাণে কম গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। দৈনিক ২৪শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা যেখানে আমরা পাচ্ছি ১৫শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। গ্যাস সরবরাহে বিদ্যুৎ, সার ও শিল্পকারখানাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে আবাসিকে গ্যাস প্রাপ্তির বিষয়টি পরে আসে। একদিকে সরবরাহ কম, এর সঙ্গে প্রাধান্য বিবেচনায় গ্যাস সরবরাহ দেওয়ায় আবাসিকের গ্রাহকরা গ্যাস কম পাচ্ছেন। যত দিন গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে না তত দিনে আবাসিকে গ্যাস সংকট পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে না।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় গতকালও স্টেশনগুলোতে ছিল গাড়ির দীর্ঘ লাইন। গ্যাস নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে চালকরা চাহিদার অর্ধেক পরিমাণ গ্যাসও নিতে পারেননি। স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানান, কমপ্রেসার চালু রেখেও পর্যাপ্ত গ্যাস তোলা যাচ্ছে না। অন্যদিকে অটোগ্যাসের (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সংকটের কারণে ঢাকার অটোগ্যাস স্টেশনগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে জানান বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ। মিরপুরের এক প্রাইভেটকার চালক আবদুস সাত্তার বলেন, ‘আগে যেখানে ৩শ থেকে ৪শ টাকার গ্যাস নিতে পারতাম এখন ১ থেকে দেড় শ টাকার বেশি গ্যাস নেওয়া যাচ্ছে না।’ গ্যাস সংকটের কারণে নগরীর হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলোতেও পড়েছে চাপ। টানা কয়েক দিন গ্যাস সংকটের কারণে মিরপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলীসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত রান্না না হওয়ায় অনেক পরিবার থেকে এসব হোটেলে খাবার খেতে মানুষের ভিড় বেড়েছে।