জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) চলছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশটির সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে গণহত্যা মামলার শুনানি। শুক্রবার শুনানিতে অংশ নিয়ে গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে সেটিকে ‘ভিত্তিহীন’ দাবি করেছেন মিয়ানমারের আইনজীবী কো কো হ্লেইং। একই সঙ্গে দেশটির সামরিক বাহিনীর অভিযানের জেরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানান তিনি।
শুনানিতে মিয়ানমার সরকারের আইনজীবী কো কো হ্লাইং বিচারকদের বলেন, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন। অভিযোগের ক্ষেত্রে গাম্বিয়া পর্যাপ্ত প্রমাণও হাজির করতে পারেনি। ২০১৭ সালে আরাকানে যা ঘটেছিল- তা ছিল সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান। ওই বছর জুলাই মাসে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য রাখাইনে পুলিশ ও সেনা ছাউনি লক্ষ্য করে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে রাখাইনকে সন্ত্রাসীদের দখলে যেতে দেওয়ার জন্য অলস হয়ে বসে থাকা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি আরও বলেন, ২০১৭ সালের জুলাই-আগস্ট-সেপ্টেম্বরে রাখাইনে ক্লিয়ারিংস অপারেশন হয়েছে। ‘ক্লিয়ারিং অপারেশন্স’ একটি সামরিক পরিভাষা, যার অর্থ জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমন করা। কিন্তু এই অপারেশনকেই গণহত্যা বলে বহির্বিশ্বে চালানো হয়েছে, যা মিয়ানমার ও মিয়ানমারের জনগণকে অমোচনীয় কলঙ্কে কলঙ্কিত করেছে। এ সময় গাম্বিয়ার আইনজীবী ফিলিপ স্যান্ডস বলেন, ধারাবাহিক গণহত্যামূলক নীতি নেওয়াই হয়েছিল মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব মুছে দিতে। নারী-শিশু ও বয়স্কদের হত্যা, পাশাপাশি তাদের গ্রামগুলোকে ধ্বংস করা কোনোভাবেই সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম বলা যায় না। সব প্রমাণ একত্রে বিবেচনায় নিলে, আদালত কেবল এই যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্তেই পৌঁছাতে পারে যে মিয়ানমার জেনে-বুঝে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিল, সেগুলোর উদ্দেশ্যই ছিল তাদেরকে নির্মূল করা। জবাবে মিয়ানমারের আইনজীবী হ্লাইং বলেন, রাখাইন রাজ্যের যারা এখন বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আছে, তাদের ফেরাতে মিয়ানমার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু কভিড-১৯-এর মতো বাইরের অনেক কিছু এতে বাদ সেধেছে। ২০১৭ সাল থেকে এ বিষয়ে মিয়ানমারের প্রতিশ্রুতি ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা গাম্বিয়ার বয়ানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। গণহত্যা প্রমাণিত হলে তা আমার দেশ ও এর জনগণের গায়ে এক অমোচনীয় কালি লাগিয়ে দেবে, সে কারণেই এ সংক্রান্ত রায় আমার দেশের সুনাম ও ভবিষ্যতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গাসহ প্রত্যক্ষদর্শীদের কথা শোনার জন্য আদালত তিন দিন সময় রেখেছে। তবে এই অধিবেশনগুলোতে সাধারণ লোকজন ও গণমাধ্যম ঢুকতে পারবে না। এ বছরের শেষ নাগাদ এই মামলার চূড়ান্ত রায় আসতে পারে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে বেসামরিক রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযানের পরপরই জাতিসংঘের একটি অনুসন্ধানী দল এ ঘটনার তদন্ত করেছিল। সেই দলের তদন্ত প্রতিবেদনে সেনাবাহিনীর অভিযানকে ‘গণহত্যামূলক তৎপরতা’ বলে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম প্রধান রাষ্ট্র গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিজেতে গণহত্যার মামলা করে।