‘গুম থাকা অবস্থায় দিনরাতের পার্থক্য বুঝতে পারতাম না। দিন গুনতাম খাবার দেখে। খাবারের জন্য রুটি এলে বুঝতে পারতাম নতুন দিন শুরু হয়েছে।’ কথাগুলো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী হুম্মাম কাদের চৌধুরীর। গুম-নির্যাতনের ঘটনায় করা একটি মামলায় গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া গুম-নির্যাতনের বর্ণনা দেন। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১ হুম্মাম কাদেরের জবানবন্দি গ্রহণ শেষে এ মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ২৫ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন। এদিকে চব্বিশের গণ আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জে এক শিশুসহ ১০ জনকে হত্যা ও অসংখ্য আন্দোলনকারীকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় সাবেক এমপি, আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আসামিদের গ্রেপ্তার করে ২৬ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালে হাজির করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল ট্রাইব্যুনাল-১ এ আদেশ দেন। অভিযোগ আমলে নিয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদনে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইস তামীম। তিনি সাংবাদিকদের জানান, আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) গুম করে নির্যাতনের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার বিচার শুরু হয় চিফ প্রসিকিউটরের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। এ মামলায় ১৩ আসামির মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া বাকি সবাই সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তা। সূচনা বক্তব্যের পর মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন হুম্মাম কাদের চৌধুরী। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। তাঁর বাবা বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির প্রয়াত সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসি কার্যকর হয় তাঁর। সূচনা বক্তব্যের পর চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘জাতিসত্তা রক্ষার স্বার্থে গুমের বিচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়েছে।
শেখ হাসিনার ১৭ বছরের শাসনামলে গুমকে সংস্কৃতিতে পরিণত করা হয়েছিল। আর এসব কাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থাকে ব্যবহার করেছে সরকার।’ জবানবন্দির শুরুতে হুম্মাম নিজের পরিচয় তুলে ধরে বলেন, ‘আমি একজন রাজনীতিবিদ। ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট আমাকে গুম করা হয়। গুম থাকা অবস্থায় আমি দিনরাতের পার্থক্য বুঝতে পারতাম না। দিন গুনতাম খাবার দেখে। খাবারের জন্য রুটি এলে বুঝতাম নতুন দিন শুরু হয়েছে। দুপুর ও রাতের খাবারে থাকত ভাত, এক পিস মাছ অথবা এক পিস মুরগি, সঙ্গে কিছু সবজি। একদিন বিরিয়ানি দেওয়া হলে আমি বুঝতে পারি সেটি ঈদের দিন ছিল।’ জবানবন্দিতে হুম্মাম বলেন, ‘প্রথম দুই মাস একটি পেরেক দিয়ে দেয়ালে দাগ দিয়ে দিনের হিসাব রাখতাম। দুই মাস পর হিসাব রাখা বন্ধ করে দিই। পেরেকটি জানালার কোনায় পেয়েছিলাম।’ কক্ষের ভিতর দেয়ালে অনেক কিছু লেখা ছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন হুম্মাম কাদের। হুম্মাম বলেন, ‘বুঝতে পারি আমার আগে যারা এ কক্ষে বন্দি ছিলেন, সেগুলো তাদের লেখা। একজন লিখেছিলেন-“আপনাকে কত দিন এখানে রাখা হবে, তা কেউ আপনাকে বলবে না”।’ অন্য পাশের দেয়ালে বাংলাদেশের পতাকা আঁকা ছিল বলে উল্লেখ করেন হুম্মাম। বলেন, ‘আমি যে কক্ষে ছিলাম তার দৈর্ঘ্য ১৫ থেকে ১৮ ফুট। প্রস্থ ৮ থেকে ১০ ফুট। আমি দেয়ালের এক কোনায় ইনিশিয়াল (এইচকিউসি) ও গুম হওয়ার তারিখ পেরেক দিয়ে লিখে রেখেছিলাম।’ এ মামলার আসামিদের মধ্যে তিনজন গ্রেপ্তার আছেন। তাঁরা হলেন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক তিন পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। তাঁদের গতকাল ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। মামলার বাকি ১০ আসামি পলাতক।