চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় আজ। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এ রায় ঘোষিত হবে।
‘চানখাঁরপুল মামলা’ হিসেবে পরিচিত এ মামলাটি পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় রায়। ২৪ ডিসেম্বর প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য প্রস্তুত হয়। আজ এ রায় ঘোষণার পুরো কার্যক্রম বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে বলে প্রসিকিউশন জানিয়েছে। চব্বিশের মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় প্রথম আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হয় এ মামলাটিতেই। ১৭ নভেম্বর এ ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালকে মৃত্যুদণ্ড এবং সাবেক পুলিশপ্রধান (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামনুকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। চানখাঁরপুল মামলায় সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান হাবিবসহ আট আসামিই পুলিশের। রায়ে আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড হবে বলেই আশা প্রসিকিউশনের। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের দাবি, প্রসিকিউশন অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ, তাই তাঁদের মক্কেলরা খালাস পাবেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ এ মামলার আট আসামির মধ্যে চারজনই পলাতক। হাবিবুর রহমান ছাড়া পলাতক অন্য আসামিরা হলেন ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলাম ও রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুল। গ্রেপ্তার থাকা চার আসামি হলেন শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক মো. আরশাদ হোসেন, সাবেক কনস্টেবল মো. সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন ও মো. নাসিরুল ইসলাম।
রায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে প্রসিকিউশন। আমরা ট্রাইব্যুনালের কাছে সর্বোচ্চ সাজার আর্জি জানিয়েছি।’
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী জিয়াউর রশিদ টিপু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘কোনো অভিযোগই প্রমাণ করতে পারেনি প্রসিকিউশন। তারা যে ভিডিও ক্লিপ দাখিল করেছে তা-ও ঝাপসা। তাই আমার আসামি খালাস পাবেন বলেই আমি মনে করি।’
গত বছর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের দিন রাজধানীর চানখাঁরপুলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ছয় আন্দোলনকারী। তাঁরা হলেন শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মাহদি হাসান জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া।
এ ঘটনায় অভিযোগ দাখিলের পর ছয় মাস ১৩ দিনে তদন্ত শেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। গত বছরের ২০ এপ্রিল চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেয় সংস্থাটি। এটিই ছিল জুলাই-আগস্টের গণ আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার প্রথম তদন্ত প্রতিবেদন। পরে ২৫ মে মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হলে ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নেন। শুনানির পর গত বছর ১৪ জুলাই আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
এরপর ১১ আগস্ট চিফ প্রসিকিউটরের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মামলার বিচারকাজ। ওই দিন শুরু হয় সাক্ষ্য গ্রহণ। ২৩ কার্যদিবসে ২৬ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। আসামিপক্ষে দুজন সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছেন। ১৫ ডিসেম্বর এ মামলায় যুক্তিতর্ক শুরু করে প্রসিকিউশন। আসামিপক্ষ শুরু করে ২২ ডিসেম্বর। ২৪ ডিসেম্বর উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলে রায় ঘোষণার জন্য আজকের দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ : ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে চানখাঁরপুল এলাকায় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা, অপরাধ সংঘটনে নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা ও ষড়যন্ত্রের একটি অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই থেকে গণ আন্দোলনের ধারাবাহিক বর্ণনা তুলে ধরে বলা হয়েছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থকে নিরীহ, শান্তিপ্রিয় ও মুক্তিকামী মানুষ ঢাকা অভিমুখে রওনা হয়। ওই দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসংলগ্ন চানখাঁরপুল ও আশপাশ এলাকায় প্রাণঘাতী অস্ত্রে সজ্জিত ৪০ থেকে ৪৫ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ও তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তীর ভূমিকা তুলে ধরে অভিযোগে বলা হয়েছে, সেদিন তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান তাঁর অধীনদের ওয়্যারলেস মেসেজের মাধ্যমে নিরীহ, নিরস্ত্র শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর ডিএমপির তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তীর নির্দেশ ছিল আন্দোলনকারীদের গুলি করে লাশ ফেলে দিতে। শুধু তাই নয়, সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণের তদারকি করেন। এ ছাড়া টার্গেট করে নির্বিচার গুলির নির্দেশনা দিয়েছিলেন ডিএমপির রমনা জোনের তৎকালীন এডিসি শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলাম। তাঁর এ নির্দেশনাতেই রমনা জোনের তৎকালীন এসি মোহাম্মদ ইমরুল ও পুলিশ পরিদর্শক মো. আরশাদ হোসেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে অধীন পুলিশ সদস্যদের গুলি করার নির্দেশ, প্ররোচনার পাশাপাশি গুলি করায় সহায়তা করেন। এর পরই কনস্টেবল মো. সুজন হোসেন, কনস্টেবল ইমাজ হোসেন ইমন ও মো. নাসিরুল ইসলাম প্রাণঘাতী অস্ত্র চায়না রাইফেল দিয়ে টার্গেট করে আন্দোলনরত নিরীহ, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালান। তাঁদের গুলিতে শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মাহাদী হাসান জুনায়েদ ওরফে মোস্তাকিন, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মোহাম্মদ ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া ওরফে শাহারিক চৌধুরী নিহত হন।