সুতার ওপর শুল্ক আরোপ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছেন দেশের পোশাক ও বস্ত্র খাতের ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে বস্ত্র ও পোশাক খাতে শীর্ষ তিন সংগঠনের নেতারা নিজ নিজ ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় সোচ্চার হয়েছেন। পোশাক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) জানিয়েছে, শুল্ক আরোপের ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। বস্ত্র খাতের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) বলছে, তাদের কারখানাগুলোতে সুতার স্তূপ জমা পড়েছে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বাকিগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ জানায়, নিট পোশাক খাত থেকে বছরে ২৭ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় আসে। সুতার শুল্ক অরোপের সিদ্ধান্তের কারণে এ খাত ঝুঁকির মুখে। দেশি মিলগুলো উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত সুতা সময়মতো সরবরাহ করতে না পারায় আমদানির পথ রুদ্ধ হলে উৎপাদন শিডিউল এলোমেলো হবে। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কোটি মানুষের কর্মসংস্থান রক্ষায় সুতা আমদানিতে শুল্কারোপের সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানায় তারা।
বিটিএমএ বলছে, দেশে ১ কেজি সুতার উৎপাদন খরচ ৩ ডলার। অন্যদিকে একই মানের সুতা ভারত উৎপাদন করে ২ ডলার ৮৫ সেন্ট থেকে ৯০ সেন্টে। ভারত সেই সুতা বাংলাদেশে এখন ২ দশমিক ৫ ডলারে রপ্তানি করছে। এতে ইতোমধ্যে বিটিএমএর ৫০টি কারখানা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বর্তমানে বস্ত্রকলগুলোয় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত পড়ে আছে।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ বলেন, ‘বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত আমদানির মাধ্যমে তৈরি পোশাক খাতের দেশি প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো বাস্তব সুবিধা পাচ্ছে না। বরং এ সুবিধা ভোগ করছে বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। অন্যদিকে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেও পাশের দেশের সরকার কর্তৃক প্রদত্ত প্রতি কেজিতে প্রায় ৫০ সেন্ট ভর্তুকি প্রদান করার কারণে টিকে থাকতে পারছে না। এসব বিবেচনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) কিছু সুতা বন্ড সুবিধার আওতামুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে, যার শতভাগ সরবরাহ করার সক্ষমতা আমাদের দেশি মিলের রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে (বিটিটিসি) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিটিএমএ, বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর সঙ্গে আলোচনার পরেই ট্যারিফ কমিশন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দাখিলকৃত তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে শুধু ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা বন্ড সুবিধার বাইরে রাখার সুপারিশ করেছে।’
বিজিএমইএ জানায়, ৮ জানুয়ারি ট্যারিফ কমিশন সভার কার্যবিবরণী প্রকাশ হয় ১৩ জানুয়ারি। কিন্তু তার এক দিন আগেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বন্ধের জন্য এনবিআরকে চিঠি দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশে সুতা আমদানির ক্ষেত্রে মোট শুল্ক প্রায় ৩৯ শতাংশ। তবে রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের জন্য বিদ্যমান বিশেষ বন্ড সুবিধার কারণে এ সুতা শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা হয়। বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে কার্যত সেই ৩৯ শতাংশ কর আরোপ হয়ে যাবে, যা এখন শূন্য। কয়েক দশক ধরে বন্ড এবং ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধাই বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে আজকের বিশ্ববাজারে শক্তিশালী অবস্থান এনে দিয়েছে।
এখন দেশি স্পিনিং মিলগুলোর সুরক্ষার নামে সুতা আমদানিতে কৃত্রিম বাধা দেওয়া হলে ক্রেতারা অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নেবে অথবা সরাসরি বিদেশ থেকে গ্রে ফ্রেবিক আমদানির নির্দেশ দেবে।
বিজিএমইএ আরও জানায়, প্রতিবেশী দেশগুলোর সুতার ভর্তুকির বিষয়ে বিটিএমএ সভাপতির তথ্যে গরমিল রয়েছে। একেক জায়গায় একেক রকম তথ্য দিয়েছে। ব্যবসায়ী সম্প্রদায় বরাবর বলে আসছে, আমরা এখনো এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পারি নাই, প্রস্তুতি নিচ্ছি। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন অন্তত তিন বছরের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হোক। গ্র্যাজুয়েশনের পর রপ্তানি সুবিধা পেতে হলে দেশি সুতাই ব্যবহার করতে হবে, এটা সঠিক তথ্য নয়। নিয়ম হলো ‘ডাবল ট্রান্সফরমেশন’ অর্থাৎ সুতা থেকে কাপড় আর কাপড় থেকে পোশাক যদি দেশে তৈরি হয়, তবেই সুবিধা পাওয়া যাবে। বিদেশ থেকে সুতা এনে আমরা যদি দেশেই কাপড় আর পোশাক বানাই, তবেই অনায়াসে নিয়ম অনুযায়ী ৬০ শতাংশ মূল্য সংযোজন হয়। তাই সুতা আমদানির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।