গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখার সূচনা হলেও সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে দেশ হোঁচট খাচ্ছে। দুর্নীতি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা, অথচ বর্তমান সরকার টেকসই কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে, ফলে সাধারণ মানুষ উপেক্ষিত বোধ করছে। গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংলাপ অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
‘অর্থনৈতিক শাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ’ শীর্ষক এ সংলাপের আয়োজন করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)। অনুষ্ঠানে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিতকরণ, ব্যাংকিং খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কার, দুর্নীতি দূরীকরণ এবং একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সিজিএসের সভাপতি ড. জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে ও নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) ড. সায়মা হক বিদিশা, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) নির্বাহী পরিচালক ড. এম. আবু ইউসুফ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সাবেক সভাপতি শাহেদুল ইসলাম হেলাল, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি)-এর স্কুল অব বিজনেসের ডিন এম এ বাকী খলীলী, বারভিডার সভাপতি আবদুল হক, জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. সরদার এ নাঈম প্রমুখ।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাদের রিপোর্ট দেওয়া হবে, কোন কাজ হয়েছে, কোনটি হয়নি, এটি পরবর্তী সরকারের জন্য সহায়ক হবে। দুর্নীতি সবসময় ছিল এবং এখন রাজনৈতিকভাবে আরও জটিল। রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও হয়রানি সিস্টেমেটিক হয়ে গেছে। স্থায়ী স্বার্থেও সংঘাত কমানোর পথ ভাবতে হবে। আমলাদের বেশি ক্ষমতায়ন হয়েছে। বিনিয়োগ স্থবির, কর্মসংস্থান কম, ট্যালেন্টেড তরুণরা দেশেই থাকতে চায় না। ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ভালো মানুষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করলে সংসদেও ভালো মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করা জরুরি। ভালো মানুষ সংসদে গেলে সংসদকে জবাবদিহিমূলক করা সম্ভব হয়। সংসদ সদস্যদের অবশ্যই ফুলটাইম এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কারণ, ব্যবসায়ী বা অন্য পেশাজীবীরা সংসদে গেলে অনেক সময় সংসদ সদস্য হওয়াকে পার্টটাইম দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করেন এবং এই পদমর্যাদার প্রভাব ব্যবহার করে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিল করেন। ড. জিল্লুর রহমান বলেন, চলতি বছর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পথে থাকলেও, সে জন্য দেশ কতটা প্রস্তুত? আর্থিক খাতে কিছু সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো টেকসই হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, দেশে নানা ধরনের নীতিমালা প্রণয়ন করা হলেও সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। কেন নীতিগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না, সে বিষয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা ও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। ড. এম আবু ইউসুফ বলেন, আমাদের সবখানেই রাজনীতি। এটি কীভাবে ঠিক করতে পারি? রাজনীতি থেকে সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে আলাদা করতে হবে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা কতটুকু আছে?
আবদুল হক বলেন, চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বিদায় নেওয়া সরকার প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করেই একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছিল, যার নেতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষের জনজীবনে পড়েছিল।