রাজধানীর শাহজাদপুরের সৌদিয়া নামে আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে চারজনের মৃত্যু হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ভিতরে গিয়ে দেখতে পান ৬ তলায় ছাদের দরজার সামনে পড়ে আছে তিনটি নিথর দেহ। একজনের মৃতদেহ পাওয়া যায় হোটেলের ওয়াশরুমে। গত বছরের ৩ মার্চের এ ঘটনায় কারও শরীর দগ্ধ হয়নি। ছাদ খোলা থাকলে জীবন বাঁচাতে পারতেন তারা। গত ১৪ অক্টোবর রাজধানীর রূপনগরে কেমিক্যাল গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডে পাশের গার্মেন্টের ১৭ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ছাদে যাওয়ার দরজা তালাবদ্ধ থাকায় গুদাম থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত গ্যাসের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয় তাদের। সবশেষ ১৬ জানুয়ারি রাজধানীর উত্তরায় ১৪ নম্বর সেক্টরের বাসায় অগ্নিকাণ্ডে ঝরে যায় ছয় প্রাণ। দ্বিতীয় তলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও ছাদ তালাবদ্ধ থাকায় পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার বাসিন্দাদের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়। জানা গেছে, অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ না হলেও ঊর্ধ্বমুখী ধোঁয়ার যমদূত হয়ে ওঠার ঘটনা অহরহ ঘটছে। কেউ পরিবারসহ, কেউ শিশুসন্তানসহ ধোঁয়ার কাছে জীবন সঁপে দিচ্ছেন। ফায়ার সার্ভিস বলছে, ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ফ্লোরের ওপরের তলাগুলোর বাসিন্দাদের জীবন রক্ষায় একমাত্র উপায় হতে পারে বাসার ছাদ। ছাদে আশ্রয় নিলে তাদের উদ্ধার সম্ভব। ছাদে আগুনের ধোঁয়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় জীবন নাশ করার আশঙ্কা খুবই কম থাকে। অথচ নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে তালাবদ্ধ ছাদের শহরে পরিণত হয়েছে রাজধানী ঢাকা।
ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে আবাসিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা বেশি। মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি। ২০২৫ সালে শুধু বাসাবাড়ি ও বহুতল আবাসিক ভবনেই ঘটে ৮ হাজার ৪৬৪টি অগ্নিকাণ্ড। ২০২৪ সালে ৭ হাজার ২৮৪টি বাসাবাড়ি ও বহুতল আবাসিক ভবনে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ২০২৪ সালে শুধু আবাসিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডে ৬০ জন মারা যান, আহত হন ৭৯ জন। বহুতল বাণিজ্যিক ভবনে আগুনে মারা যান ৪৭ জন, আহত হন ৭৮ জন। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় ভবনের ছাদ তালামুক্ত রাখা বাসিন্দাদের জীবন রক্ষার জন্য কতটা জরুরি, বলেন সংশ্লিষ্টরা।
ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক (ডিডি) মো. ছালেহ উদ্দিন বলেন, আগুন, ধোঁয়া ও তাপ সবসময় ঊর্ধ্বমুখী। আগুন দ্রুত ওপরের তলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। ভবনের সিঁড়ি আগুনের টানেল হিসেবে কাজ করে। ওপরের তলাগুলোর অক্সিজেন শূন্য করে ফেলে। আগুনের সূত্রপাত যেখানে হয় তার ওপরের তলাগুলোতে মানুষ মারা যাচ্ছে। ছাদ হতে পারে জীবন বাঁচানোর একমাত্র পথ। ছাদে যেতে পারলে ফায়ার সার্ভিস দ্রুত উদ্ধার করতে পারবে। তালা লাগানো থাকায় মানুষ ছাদে আশ্রয় নিতে পারেন না। দগ্ধ না হয়েও ধোঁয়ায় মারা যাচ্ছেন। এই সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। জীবন বাঁচানোর স্বার্থে ছাদ তালাবদ্ধ রাখা উচিত নয় বলে মনে করেন তিনি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ গত মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে জানান, অগ্নিকাণ্ড কিংবা ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন ঝুঁকি বিবেচনায় নিরাপত্তার স্বার্থে বাড়িওয়ালা প্রত্যেক ভাড়াটিয়াকে ছাদ ও মূল গেটের চাবি শতভাগ প্রদান করবেন। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, কোনো ভবনের বাসিন্দা বাড়ির মালিক ছাদের চাবি দিচ্ছেন না বলে অভিযোগ করলে রাজউক যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। তালাবদ্ধ ছাদ যেহেতু মৃত্যুঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হবে। এদিকে ২০২১ সালের ২৩ এপ্রিল পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় চারজন মারা যান। ভবনটির নিচতলায় ছিল প্লাস্টিকের গুদাম। আগুন লাগার পর মুহূর্তের মধ্যে তা ওপরের দিকে উঠতে থাকে। ওপরে আটকে পড়া বাসিন্দারা ছাদ তালাবদ্ধ থাকায় ওপরে যেতে পারেননি। অনেকে জানালা দিয়ে মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে ফায়ার সার্ভিসের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। ২০২১ সালের ৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের (সজীব গ্রুপ) কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৫২ শ্রমিক নিহত হন। ছাদের কলাপসিবল গেট বন্ধ থাকায় অনেক শ্রমিক বের হতে পারেননি বলে অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক ও বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডের পর ছাদের অব্যবস্থাপনার কথা উঠে আসে বেঁচে ফেরাদের কাছ থেকে।