জামায়াতের মনোনয়ন ক্যারিশমায় রাতারাতি আলোচিত হয়ে উঠেছে খুলনা-১ আসন। বলা যায়, ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা বাংলাদেশের দৃষ্টি এ আসনকে ঘিরে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জামায়াতের হিন্দু প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী নির্বাচনি মাঠে লড়াই করছেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় জামায়াত এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কৃষ্ণ নন্দী প্রতিদিনই স্থানীয় জামায়াতের নেতা-কর্মীদের নিয়ে গণসংযোগ করছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে ভোট চাইছেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে। অন্যদিকে জামায়াতের নেতা-কর্মীরাও অংশ নিচ্ছেন প্রচারে। নির্বাচনে আসনটি থেকে মোট ১২ জন প্রার্থী লড়ছেন। এর মধ্যে আটজনই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এক সময়ের জাতীয় পার্টির নেতা সুনীল শুভ রায় এ আসনে ভোটের মাঠে আছেন আরেকটি ইসলামী দলের মোমবাতি প্রতীক নিয়ে। বাটিয়াঘাটা ও দাকোপ উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-১ আসনটি বাংলাদেশের সংসদীয় আসনের ৯৯ নম্বর। এখানে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭ হাজারের মতো। আগের ১২টি নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ এমপি হিসেবে পেয়েছে নয়জনকে, বিএনপি দুজনকে ও জাতীয় পার্টি একজনকে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাও এ আসন থেকে লড়েছেন একবার। এবারের নির্বাচনে এ আসনে ধর্মীয় বিষয়টিকে বড় ফ্যাক্টর বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা। সরেজমিন নির্বাচনি এলাকায় গেলে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে তারা জানান, এখানে হিন্দু ভোটার বেশি থাকায় রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে হিন্দুদের গুরুত্ব দিয়েছে বেশি। বিশেষ করে জামায়াত চমক দেখিয়ে প্রার্থী করেছে কৃষ্ণ নন্দিকে। স্থানীয়ভাবে ভালো ভাবমূর্তির অধিকারী কৃষ্ণ নন্দীর হাতে দাঁড়িপাল্লা তুলে দিয়ে মূলত জামায়াত এ আসনটি নিজেদের অধীনে আনতে চাইছে। এদিকে আসনটিকে আলাদা গুরুত্ব দিতে দেখা গেছে স্থানীয় প্রশাসনকে। শহর থেকে দূরে হওয়ায় আসনটি কিছুটা প্রত্যন্ত এলাকা হিসেবে পরিচিত। সরেজমিন এ আসনটিতে গেলে দেখা গেছে, প্রশাসনের ভালো তৎপরতা। বাজার, বাসস্ট্যান্ড মোড়ে অবস্থান নিতে দেখা গেছে পুলিশ টিমকে। পাশাপাশি সাদা পোশাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও কড়া দৃষ্টি রাখছে। এ ছাড়া সেনাবাহিনী সদস্যদেরও টহল দিতে দেখা গেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আসনটিকে স্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই যেকোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে বাড়তি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সরেজমিন বাংলাদেশ প্রতিদিনের পক্ষ থেকে প্রায় ৩০ জন ভোটারের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। বাটিয়াঘাটা বাজারের মুরগি ও মাছ ব্যবসায়ী টুলু ঢালী ও আরোহী মণ্ডল এ সময় বলেন, এখানে ভোটের হিসাব কিছুটা জটিল। আমাদের মতো হিন্দুদের নিয়ে এখানে রাজনীতি শুরু হয়েছে। ১২ জনের মধ্যে আটজন হিন্দু প্রার্থী। আবার আমাদের মধ্যেও রয়েছে চারটি ভাগ। তাই হিন্দুদের সব ভোট একতরফাভাবে কেউ পাবেন- এমন নিশ্চয়তা নেই। এখানে হবে ভাগাভাগির ভোট। তারা বলেন, এলাকার উন্নয়নে যিনি বেশি কাজ করতে সক্ষম তাকেই নির্বাচিত করার চেষ্টা করা হবে।
এ আসনে জামায়াতের হিন্দু প্রার্থীর পাশাপাশি রয়েছেন বিএনপির আমির এজাজ খান। স্থানীয়রা জানান, এখানে ‘ধর্ম কার্ডে’র পাশাপাশি ব্যক্তিগত ইমেজও একটা বড় ফ্যাক্টর। কৃষ্ণ নদীর ব্যক্তিগত ইমেজ ভালো থাকলেও তিনি একজন দাদন ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় অনেক ভোটার তার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা ও সংসার পরিচালনা করছেন। শেষ মুহূর্তে ঋণের সুদ মওকুফ করার ‘টনিক’ ব্যবহার করে তিনি ভোটারদের কাছে ভোট চাইছেন বলে জানান অনেকে। অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী আমির এজাজ খান ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে নির্যাতিত নেতা হিসেবে চিহ্নিত। তবে ৫ আগস্ট ঘটনার পর বালুমহাল দখল ও নির্বিচারে চাঁদাবাজি করেছেন, এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। কৃষ্ণ নন্দী হিন্দু হয়ে জামায়াতের মতো ইসলামী দলের প্রার্থী কীভাবে হলেন- এমন বিষয় নিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন বিএনপি প্রার্থী আমির এজাজ খান। অন্যদিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে আমির এজাজকে একজন চিহ্নিত দখলবাজ ও চাঁদাবাজ হিসেবে প্রচার চালানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে আসনটি নিজেদের অধীনে রাখতে দুই দলই মরিয়া। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে এ আসনের চিত্র তত পাল্টাচ্ছে। বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী-সমর্থকরা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি অনেক বহিরাগত এ আসনে প্রচারে অংশ নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভোটাররা। তারা জানান, প্রচারে অনেক অপরিচিত মুখ দেখতে পাচ্ছি, যাদের এলাকায় কখনো দেখিনি। তবে এ ধরনের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন দুই দলের দুই প্রার্থীই। জামায়াতের আলোচিত হিন্দুপ্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী বলেন, ‘এটা অবান্তর অভিযোগ। আমার কাছে হিন্দু-মুসলিম নিয়ে কোনো ভেদাভেদ নেই। নির্বাচিত হলে এখানে হিন্দুদের নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি মুসলমানদেরও বুকের মধ্যে রাখব।’ নির্বাচনে কোনো চ্যালেঞ্জ রয়েছে কি না- এ প্রশ্নে তিনি জানান, বড় ধরনের কোনো চ্যালেঞ্জ দেখছি না। তবে বিএনপি প্রার্থী আমার নেতা-কর্মীদের নানা সময় হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছেন। নির্বাচন কমিশনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছেন কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো অভিযোগ করিনি।
জামায়াত প্রার্থীর এ ধরনের অভিযোগ প্রসঙ্গে বিএনপির আমির এজাজ খান বলেন, ‘হুমকি-ধমকির কোনো প্রমাণ উনি দেখাতে পারবেন না। ৪০ বছর ধরে রাজনীতি করছি। এ আসনে ১১৯টি কেন্দ্র রয়েছে। আমার বিশ্বাস, প্রতিটা কেন্দ্রে আমি ফার্স্ট হব। তাই আমার জন্য কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ নেই। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা রয়েছে, ভোটারদের মধ্যেও শঙ্কা রয়েছে।’ তিনি জানান, অনেক ভোটার আমাকে বলেছেন, আমরা আপনাকে ভোট দেব কিন্তু সেই ভোট আপনি বুঝে নিতে পারবেন তো?
বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা আরও জানান, শেষ তিনটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ব্যাপক কারচুপি করেছে। নির্বাচন তো দূরের কথা, কোনো ধরনের সাংগঠনিক কার্যক্রমও এখানে পরিচালনা করতে দেওয়া হয়নি। বলা যায়, আসনগুলো তারা জবরদখল করেছিল। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ এবারে নির্বাচনে নেই। জনগণের মধ্যে ভোট ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমরা এখানে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করেছি। এতে তৃণমূল ভোটারদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।