চা-বাগান, সবুজ পাহাড় প্রাকৃতিক বন আর হাওড়-এ চার ঐতিহ্য সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলাকে সমৃদ্ধ করেছে। মনু নদীর তীরে অবস্থিত এ জেলাটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় স্থান। এখানে ৯৩টি চা-বাগান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, বাইক্কা বিল এবং এশিয়ার বৃহত্তম হাওড় হাকালুকির মতো মিঠাপানির জলাশয় রয়েছে। সারা দেশের মতো এ পর্যটন জেলাতেও বইছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের হাওয়া। রাস্তাঘাট, দোকানপাট, অফিস-আদালতে আলোচনা চলছে কে জিতবে, কার দখলে যাবে এ পর্যটনসমৃদ্ধ এলাকা? তবে সরেজমিন মৌলভীবাজার বিভিন্ন আসনের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার অন্তত দুটি আসনে জোটের জটে আটকে গেছেন জামায়াত সমর্থিত ১১ দলীয় প্রার্থীরা। বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে একটি আসনে দ্বিধাবিভক্ত বিএনপি সমর্থকরাও। তবে দলীয়ভাবে বিএনপি এবার আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত এলাকা থেকে সুফল পাওয়ার আশা করছে। এ লক্ষ্যে তারা এরকম দুর্গগুলো দখলে সর্বাত্মক তৎপরতাও চালাচ্ছে।
মৌলভীবাজার-১ আসনে ভোটব্যাংকের ওপর ভরসা জামায়াতের : বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলা নিয়ে মৌলভীবাজার-১ আসনে নির্বাচন হচ্ছে। আসনটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৮১৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭২ হাজার ৯৯৮ জন, মহিলা ভোটার ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮১৬ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার দুজন। এ আসনে সর্বশেষ তিনটি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের শাহাব উদ্দিন। এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ছয় প্রার্থী। বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন নাসির উদ্দিন আহমদ (মিঠু)। তিনি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। ২০১৮ সালেও তিনি একই আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচন করছেন জামায়াতে ইসলামীর আমিনুল ইসলাম। তিনি জেলা জামায়াতের কর্ম ও শুরা সদস্য। এ ছাড়া লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির আহমেদ রিয়াজ উদ্দিন, ট্রাক প্রতীকে গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি ও নিরাপত্তাবিষয়ক সহসম্পাদক আবদুর নূর তালুকদার, মাছ প্রতীকে গণফ্রন্টের মো. শরিফুল ইসলাম এবং কাপ-পিরিচ প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী বেলাল আহমদ নির্বাচন করছেন। সীমান্তবর্তী এ আসনে জামায়াতের রয়েছে একটি বিশাল ভোটব্যাংক। চতুর্মুখী লড়াই হবে মৌলভীবাজার-২ আসনে : একটি মাত্র উপজেলা কুলাউড়া নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার-২ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩ হাজার ২০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৭ হাজার ১২৮ জন এবং মহিলা ভোটার ১ লাখ ৪৫ হাজার ৮৯২ জন। আসনটিকে নির্বাচনের জন্য উন্মুক্ত আসন বলে মনে করছেন ভোটাররা। অতীতের নির্বাচনি অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আসনটিতে দলের চেয়ে ব্যক্তির গুরুত্ব বেশি। যেখানে সরকার গঠন করে একটি দল নির্বাচনে বিজয়ী হয় আরেক দলের প্রার্থী। ২০১৮ সালের নির্বাচনে গণফোরামের মনোনয়নে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ এ আসনে বিজয়ী হয়েছিলেন। অবশ্য ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল নির্বাচিত হন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আট প্রার্থী। তাঁরা হলেন- বিএনপির মো. শওকতুল ইসলাম (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মো. সায়েদ আলী (দাঁড়িপাল্লা), স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য নওয়াব আলী আব্বাছ খান (ফুটবল), জাতীয় পার্টির মো. আবদুল মালিক (লাঙ্গল), স্বতন্ত্র প্রার্থী ফজলুল হক খান (কাপ-পিরিচ), স্বতন্ত্র প্রার্থী এম জিমিউর রহমান (ঘোড়া), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবদুল কুদ্দুস (হাতপাখা) এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) সাদিয়া নোশিন তাসনিম চৌধুরী (কাঁচি)। তাঁদের মধ্যে নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে কেবলমাত্র জাতীয় পার্টির কাজী জাফর গ্রুপ সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য নওয়াব আলী আব্বাস খানের। এ ভোটব্যাংকের ওপর ভর করে নির্বাচনি লড়াইয়ে আলোচনায় রয়েছেন তিনি। নওয়াব পরিবারের ঐতিহ্য হিসেবে এলাকাবাসীর কাছে তার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এ আসনে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন দলটির সাবেক সভাপতি শওকতুল ইসলাম। বিএনপি থেকে এবারই তিনি প্রথম নির্বাচন করছেন। এর আগে ২০০১ সালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ছিলেন। এখানে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন দলের জেলা কমিটির সদস্য ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি আবেদ রাজা। তাঁকে মনোনয়ন না দেওয়ায় স্থানীয়ভাবে তাঁর সমর্থক নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ।
অপরদিকে কুলাউড়া উপজেলা হচ্ছে জামায়াতের আমিরের জন্মস্থান। তবে ভোটের লড়াইয়ে আমিরের প্রভাব খুব একটা লক্ষণীয় নয়। এ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনয়ন দিয়েছে দলের জেলা শাখার আমির সায়েদ আলীকে। মৌলভীবাজার-৩ আসনে বিএনপি এগিয়ে, দ্বিধাবিভক্ত জামায়াত জোট : মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার-৩ আসন। এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮৬ হাজার ২১২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪৮ হাজার ১৩১ জন, মহিলা ভোটার ২ লাখ ৩৮ হাজার ৭৭ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার চারজন। এবারের নির্বাচনে এ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন চার প্রার্থী। তারা হলেন-বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান (ধানের শীষ), খেলাফত মজলিসের মাওলানা আহমদ বিলাল (দেওয়াল ঘড়ি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. আবদুুল মান্নান (দাঁড়িপাল্লা) ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির জহর লাল দত্ত (কাস্তে)। এ চারজনের মধ্যে ভোটের লড়াইয়ে আলোচনার শীর্ষে সাবেক অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমানের ছেলে এম. নাছের রহমান। আসনটিতে ১১ দলীয় জোট তাদের প্রার্থী হিসেবে খেলাফত মজলিসের মাওলানা আহমদ বিলালকে মনোনয়ন প্রদান করে। মৌলভীবাজার-৪ আসনে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী বিদ্রোহী প্রার্থী : শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার-৪ আসন। এখানে ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৮৮৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪৬ হাজার ১৯৭ জন, মহিলা ভোটার ২ লাখ ৪১ হাজার ৬৮৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার দুজন। আসনটি আওয়ামী লীগের দুর্গ বলে পরিচিত। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মো. ইলিয়াস। ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের জুন এবং ২০০১, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মো. আবদুস শহীদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। চায়ের রাজধানী বলে খ্যাত শ্রীমঙ্গলে চা শ্রমিকদের রয়েছে একটি বিশাল ভোটব্যাংক। এ ছাড়া সংখ্যালঘু ভোটাররাও নির্বাচনে একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে প্রভাব রাখেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ছয় প্রার্থী। তারা হলেন বিএনপির মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির বিদ্রোহী মো. মহসিন মিয়া মধু (ফুটবল), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা শেখ নূরে আলম হামিদী (রিকশা), জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রীতম দাশ (শাপলা কলি), জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ জরিফ হোসেন (লাঙ্গল) এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের মো. আবুল হাসান (মই)। এলাকার ভোটার ও চা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসনটিতে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে মূলত বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে। মৌলভীবাজার-৩ আসনের মতো এ আসনটিতেও জোটের জটে আটকে গেছেন ১১ দলীয় জোট প্রার্থী ও সমর্থকরা। এখানে ১১ দলীয় জোটের শরিক দল এনসিপির প্রার্থী প্রীতম দাশের শাপলা কলির পাশাপাশি রিকশা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন খেলাফত মজলিসের মাওলানা শেখ নূরে আলম হামিদী। (প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি সৈয়দ বয়তুল আলী)