কানের পাশের টিউমার অপারেশনের অপেক্ষায় প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগে ভর্তি রয়েছেন ময়মনসিংহের সিরাজুল ইসলাম (৬২)। তাঁর স্ত্রী আকলিমা বেগম বলেন, ‘গত সপ্তাহে হাসপাতালে আসার পর বেশ কিছু টেস্ট করালে চিকি সকরা জানান অপারেশন করতে হবে। হাসপাতালে ভর্তি হতে গেলে ওয়ার্ডে সিট না পাওয়ায় করিডরের একটা বেডে আমরা দুজন থাকছি। ছেলে সিঁড়ির নিচে থাকছে। এখানে দিনে রাতে মশা কামড়ায়। কষ্ট করে থাকছি কারণ এখানে কম খরচে ভালো চিকি সা পাওয়া যায়।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ২ হাজার ৬০০ শয্যায় প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার রোগী ভর্তি থাকে। শয্যা না থাকায় মেঝে, করিডর, বারান্দায় থাকছে রোগী। সারা দেশ থেকে রেফার্ড হয়ে কিংবা অন্য হাসপাতালে জায়গা না পেলে রোগীর শেষ ভরসা হিসেবে জায়গা মেলে ঢামেক হাসপাতালে। তাই ঢামেক হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়াতে ৪ হাজার শয্যায় উন্নীত করার মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এতে শয্যার সঙ্গে আইসিইউ, অপারেশনসহ অন্যান্য সেবারও প্রসার ঘটবে বলে জানা গেছে। এর আগে ৫ হাজার শয্যায় উন্নীত করার যে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তা বাতিল হয়েছে। এ ব্যাপারে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ৫ হাজার শয্যায় উন্নীত করার মেগা প্রকল্প বাতিল হয়েছে। ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর প্রকল্পটি আর এগোয়নি। মেগা প্রকল্পের কাজ একেবারে শেষ ধাপে ছিল। শুধু হাসপাতালের আশপাশের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের একটি চূড়ান্ত বৈঠক বাকি ছিল। সেই বৈঠক হওয়ার আগেই ত কালীন সরকারের পতন ঘটে। এরপর প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ৫ হাজার শয্যায় উন্নীত করার একটি মেগা প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজের নিজস্ব জমিতে ঐতিহ্যবাহী ভবন ও স্থান অক্ষুণ্ন রেখে আনুমানিক ১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা ছিল। হাসপাতালের ১০৮ দশমিক ৫ বিঘা জমিতে হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, লাইব্রেরি, সেমিনার ও ডরমেটরির জন্য মোট ২৭টি ভবন নির্মাণের কথা ছিল। এর মধ্যে ১৭ তলাবিশিষ্ট ছয়টি হাসপাতাল ভবন, আবাসিক ভবনসহ অন্যান্য ভবন ২০ তলাবিশিষ্ট হওয়ার পরিকল্পনা ছিল। হাসপাতালে দুটি জরুরি বিভাগ এবং দুটি আউটডোর থাকার কথা ছিল।
অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দিতে মেগা প্রকল্প বাতিলের পর নতুন করে ৪ হাজার বেডের একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত হলো ৫ হাজার নয়, ৪ হাজার বেডই বাস্তবসম্মত। কারণ ঢাকা মেডিকেল একটি একাডেমিক হাসপাতাল। শুধু বেড বাড়ালেই রোগীর চাপ কমবে এমন নিশ্চয়তা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘৪ হাজার শয্যার প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরির দায়িত্ব গণপূর্ত অধিদপ্তরকে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে যৌথ বৈঠকের কথা থাকলেও এখনো তারিখ নির্ধারিত হয়নি। মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত হতে সময় লাগায় অন্তত একটি ভবনের কাজ দ্রুত শুরু করতে চায় কর্তৃপক্ষ।’ বিশেষ করে হাসপাতালের পুরোনো তিন তলা আউটডোর ভবনটি বর্তমানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে বলে জানান পরিচালক।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা আউটডোরের বিকল্প হিসেবে নতুন একটি ভবনের কাজ দ্রুত শুরু করতে চাই। প্রস্তাবিত ভবনটি ১৭ থেকে ২০ তলা হবে এবং এতে দুই থেকে তিনটি বেসমেন্ট থাকবে। বার্ন ইউনিটের পেছনের অংশে ভবনটি নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি চলতি অর্থবছরেই এ কাজ শুরু হবে।’
নতুন ভবনটি শুরুতে আউটডোর সেবার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হবে। ভবিষ্যতে মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী সেখানে প্রশাসনিক ভবন, ডে-কেয়ার সেন্টারসহ অন্যান্য সেবা যুক্ত হতে পারে বলে জানান তিনি। পরিচালক বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা হলো একটি ভবন দিয়ে শুরু করে ধাপে ধাপে পুরো হাসপাতালের উন্নয়ন। বাস্তবে এটা কেবল একটি একাডেমিক হাসপাতাল নয়, এটি দেশের সবচেয়ে বড় সার্ভিস হাসপাতাল। দেশের অনেক হাসপাতাল রোগী ফেরত দিলেও ঢাকা মেডিকেল কাউকে ফেরায় না। বর্তমানে হাসপাতালের প্রায় ৭৫ শতাংশ রোগী ইমারজেন্সির বিভাগে ভর্তি হয়, অথচ এ চাপ ভাগ করে নেওয়ার মতো কার্যকর ব্যবস্থা অন্যান্য হাসপাতালে নেই।’ এ কারণে বিকালেও সরকারি হাসপাতালগুলোতে সার্ভিস চালু রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি।