জাতীয় নির্বাচনে সিলেটে বরাবরই ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায় সনাতনধর্মাবলম্বী ও চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর ভোট। এবারের সংসদ নির্বাচনে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফুলতলী পীরের সংগঠন আঞ্জুমানে আল ইসলাহের ভোটব্যাংক। ইসলাহের কোনো নেতা কোনো আসনে প্রার্থী না হওয়ায় অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর কাছে কদর বেড়েছে দলটির। নির্বাচনি বৈতরণি পার হতে এখন প্রার্থীরা সনাতনধর্মাবলম্বী, চা শ্রমিক জনগোষ্ঠী, আঞ্জুমানে আল ইসলাহ-এ তিন ভোটব্যাংক নিজেদের আয়ত্তে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে বিএনপি, জামায়াত ও দল দুটির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক প্রার্থীরা এ তিন ব্যাংকের ভোট পেতে নানান কৌশল অবলম্বন করছেন। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিলেট জেলায় সনাতনধর্মাবলম্বীদের ২ লক্ষাধিক, চা শ্রমিকদের অর্ধলক্ষাধিক ও ফুলতলী পীরের দলের অন্তত ৫ লাখ ভোট রয়েছে। জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে সনাতনধর্মাবলম্বী ও চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর ভোট সবচেয়ে বেশি রয়েছে সিলেট-১ (সদর-সিটি করপোরেশন) আসনে। আসনটিতে মোট ভোটার ৬ লাখ ৮০ হাজার ৯৪৬ জনের মধ্যে ৩ লাখ ৫৩ হাজার ১৮৬ জন পুরুষ ও ৩ লাখ ২৭ হাজার ৭৪৭ জন নারী। সিলেট জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সহসভাপতি অধ্যাপক রজতকান্তি ভট্টাচার্যের তথ্য অনুযায়ী, এ আসনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট রয়েছে ১ লাখের কাছাকাছি। আর বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সিলেট ভ্যালির সভাপতি রাজু গোয়ালার দাবি, আসনটিতে চা শ্রমিকের ভোট রয়েছে ২০ হাজারের ওপরে। আসনটিতে আঞ্জুমানে আল ইসলাহের ভোট ৩০ হাজারের বেশি রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ড. মাওলানা মঈনুল ইসলাম পারভেজ। এ তিন ভোটব্যাংক মিলে সিলেট-১ আসনে ভোটের পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ। এরই মধ্যে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন দিয়েছে আল ইসলাহ। আর বাকি দুই ব্যাংকের ভোট নিজেদের পক্ষে রাখতে চা শ্রমিক ও হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছেন খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ও জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান। সিলেটের ছয়টি সংসদীয় আসনের চারটিতেই রয়েছে চা শ্রমিকের ভোট। এর আগে চা বাগানের ভোটব্যাংক ছিল আওয়ামী লীগের দখলে। এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকার সুযোগ নিতে বিএনপি ও জামায়াত নানান কৌশল অবলম্বন করছে। দলের নেতারা দফায় দফায় বৈঠক করে চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, বাসস্থান, চিকিৎসা ও তাঁদের সন্তানদের শিক্ষার সুব্যবস্থাসহ জীবনমান উন্নয়নে নানান প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সিলেট ভ্যালির সভাপতি রাজু গোয়ালার তথ্য অনুযায়ী, সিলেট-১ আসনে ১২টি বাগান রয়েছে। এসব বাগানে ২০ হাজারের বেশি চা শ্রমিকের ভোট রয়েছে। সিলেট-৩ আসনভুক্ত ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার তিনটি বাগানে ৬-৭ হাজার, সিলেট-৪ আসনের গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলায় ১০টি বাগানে ২০ সহস্রাধিক ও সিলেট-৫ আসনের কানাইঘাট উপজেলায় দুটি বাগানে ২ হাজারের বেশি ভোট রয়েছে। বিগত নির্বাচনগুলোতে চা শ্রমিকের ৯০ শতাংশই ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রার্থী ও সমর্থকদের প্রচারের কারণে এবারও চা শ্রমিকদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে উৎসাহ রয়েছে। তবে কী পরিমাণ শ্রমিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন, এখনো অনুমান করা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। ২০২৬ সালের ভোটার তালিকা অনুযায়ী সিলেট জেলায় ভোটার ২৮ লাখ ৭০ হাজার ৮০১ জন। এর মধ্যে সনাতন (হিন্দু)-ধর্মাবলম্বী ভোটার প্রায় ৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ। সে হিসেবে সিলেট জেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটার রয়েছে ২ লাখ ১০ হাজার ৪৩০ জন। সিলেট জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সহসভাপতি অধ্যাপক রজতকান্তি ভট্টাচার্য জানান, জেলার ছয় সংসদীয় আসনের মধ্যে সনাতনধর্মাবলম্বী ভোট সবচেয়ে বেশি রয়েছে সিলেট-১ আসনে। এ ছাড়া সিলেট-২, ৩ ও ৪ আসনেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হিন্দু ভোটার রয়েছেন।
ভোটের মাঠে গুরুত্বপূর্ণ ফুলতলী পীরের দল : সিলেটে আলেম-ওলামাদের মধ্যে সর্বজনশ্রদ্ধেয় ছিলেন প্রয়াত মাওলানা আবদুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী। সিলেট বিভাগের ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে তিনি ফুলতলীর পীর হিসেবে পরিচিত। এই পীরের হাতে গড়া সংগঠন আঞ্জুমানে আল ইসলাহ। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল না হলেও সিলেট বিভাগের প্রায় প্রতিটি উপজেলায় রয়েছে সংগঠনটির অসংখ্য নেতা-কর্মী ও শুভাকাক্সক্ষী। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগের ও দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছিলেন ফুলতলী পীরের ছোট ছেলে, আঞ্জুমানে আল ইসলাহের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা হুছাম উদ্দিন চৌধুরী। জাতীয় নির্বাচনে বিভিন্ন সময়ে দলটির একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও এটাই ছিল প্রথম বিজয়। তবে স্থানীয় নির্বাচনে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়ে চমক দেখিয়েছেন ফুলতলী পীরের দলের প্রার্থীরা।
সিলেট জেলার মধ্যে ফুলতলী পীরের সবচেয়ে বড় ভোটব্যাংক রয়েছে সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) ও সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা-ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ) আসনে। এর মধ্যে সিলেট-৫ আসনভুক্ত জকিগঞ্জের বাদেদেওরাইলে ফুলতলী পীরের বাড়ি। জকিগঞ্জ থেকে বিগত দুটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছেন আঞ্জুমানে আল ইসলাহের প্রার্থী। এ ছাড়া সিলেট-৩ আসনভুক্ত দক্ষিণ সুরমা থেকে তিনবার ও ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে একবার ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছেন আল ইসলাহের প্রার্থী। সিলেট-২ আসনের বিশ্বনাথ ও সিলেট-৬ আসনের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন ফুলতলী পীরের দলের। ফলে বিশাল এ ভোটব্যাংকের আশীর্বাদ পেতে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা আঞ্জুমানে আল ইসলাহের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা হুছাম উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করেছেন। ইতোমধ্যে কয়েকটি আসনে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে দলের নেতা-কর্মীদের আল ইসলাহের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। আঞ্জুমানে আল ইসলাহের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ড. মাওলানা মঈনুল ইসলাম পারভেজ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, সিলেট জেলার ছয়টি আসনে আল ইসলাহের প্রায় ২০ শতাংশ ভোট রয়েছে। সমর্থন পেতে বিভিন্ন দলের নেতা ও প্রার্থী মাওলানা হুছাম উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করেছেন। এরই মধ্যে কয়েকজন প্রার্থীকে দলের পক্ষ থেকে সমর্থনও দেওয়া হয়েছে।