ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিলেন শেখ হাসিনা সরকারের ২০ জন প্রভাবশালী। এদের মধ্যে সাতজন সাবেক মন্ত্রী এবং এমপি। বাকিরা সরকারের সাবেক কর্মকর্তা। সাবেক ২২ মন্ত্রী-এমপিসহ ১০২ জন বিশেষ বন্দি পোস্টাল ব্যালটে ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিলেন বলে নিশ্চিত করেছে কারাসহ একাধিক সূত্র।
কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ মোতাহার হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দিদের মধ্যে সব মিলিয়ে ২০ জন পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। তাদের কেউই চান না তাদের নাম প্রকাশ হোক। তবে রেজিস্ট্রেশন করেছিলেন ৪০ জন ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দি। সূত্র বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের ৭১টি কারাগারে থাকা বন্দিদের মধ্যে মাত্র ৭ শতাংশ এবার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। মোট বন্দির মধ্যে পোস্টাল ভোটের জন্য ৬ হাজার ৩১৩ জন রেজিস্ট্রেশন করলেও নানা জটিলতার কারণে কিছু বাদ পড়ে। অনুমোদন লাভ করে ৫ হাজার ৯৬০ জনের। নিবন্ধন করা ৩২০ জন জামিনে কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছেন। জানা গেছে, ২২ জন সাবেক মন্ত্রী-এমপির বাইরে যারা পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধন করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ক্ষমতাধর সাবেক পাঁচ সচিব, ১১ পুলিশ কর্মকর্তা ও একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। সব মিলিয়ে ঢাকার কেরানীগঞ্জ বিশেষ কারাগারে থাকা ১০২ জন বিশেষ বন্দি ভোট দিতে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন বলে নিশ্চিত করেছে কারাসূত্র। সংসদ ও গণভোটে অংশ নেওয়ার জন্য কারাগারগুলোতে প্রচার চালানো হয়েছিল। তিন সপ্তাহ ধরে অনলাইনে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। গত ৩১ ডিসেম্বর এই নিবন্ধন শেষ হয়। রাজনৈতিক বন্দিদের মধ্যে শাহজাহান খান, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, হাজি রহিমুল্লাহ, হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন, ডা. এনামুর রহমান, আবদুল লতিফ বিশ্বাস, সালাম মুর্শেদী, ডা. আজিজুল ইসলাম, আমিরুল আলম মিলন, আবু রেজা নদভী ভোট দিতে নিবন্ধন করেছিলেন। সাবেক সচিবদের মধ্যে অন্যতম হলেন- নির্বাচন কমিশনের সাবেক সচিব হেলাল উদ্দীন আহমেদ, মেজবাহ উদ্দীন, মোস্তাফা কামাল, এন এম জিয়াউল আলম। পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অন্যতম সাবেক ডিআইজি মোল্লা নজরুল ইসলাম, অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মির্জা সালাউদ্দীন, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অনির্বান চৌধুরী, অ্যাড. এসপি ইফতেখার মাহমুদ, শাহ মশিউর রহমান। কারাবন্দি মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান শিবলী রুবায়েতও ভোট দিতে নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। তবে যারা ভোট দিতে নিবন্ধন করেননি তাদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও এমপি সালমান এফ রহমান, সাবেক মন্ত্রী আনিসুল হক, আমির হোসেন আমু, ডা. দীপু মনি, কামাল আহমেদ মজুমদার, সাবেক এমপি হাজী সেলিম অন্যতম। কারা অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেন, বন্দি হিসেবে যারা ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন, তাদের মধ্যে কেউ জামিন পেলেও ভোটাধিকার প্রয়োগ করার জন্য তাকে আবার কারাগারের ভিতর নির্ধারিত বুথে যেতে হয়েছে। তবে ভিআইপি বন্দিরা এবার শর্ত দিয়েছিলেন তাদের নাম প্রকাশ করা যাবে না। সূত্র আরও বলছে, সংশ্লিষ্ট এলাকার নিবন্ধিত ভোটারদের জন্য নির্বাচন কমিশন পৃথকভাবে খাম পাঠাবে। এতে তিনটি খামে থাকবে ভোট প্রদানের নিয়মাবলি, স্বাক্ষরের জন্য নির্ধারিত স্থান ও ব্যালট পেপার। বন্দিরা ব্যালট পেপারে ভোট দিয়ে খাম সিল করবেন। প্রতিটি কারাগারের নির্দিষ্ট একটি স্থান থাকবে, যেখানে বসে বন্দিরা ভোট দেবেন। ব্যালট পেপারের খাম ও স্বাক্ষর সংবলিত কপিটি আরেকটি খামে ভরে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেবেন বন্দিরা। কারা কর্তৃপক্ষ সেগুলো পোস্ট অফিসে পাঠাবেন। ডাক বিভাগ এক্সপ্রেস ব্যবস্থায় খামগুলো নির্বাচন কমিশনে পাঠাবে। এরপর নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকায় জমা পড়া ভোটের সংখ্যা যুক্ত করবে। কারা কর্মকর্তারাও পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে পারবেন। কারা সূত্র বলছে, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী কারাগারগুলোতে বুথ তৈরি করে ভোট নিচ্ছে কারা অধিদপ্তর। গত ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে গতকাল বেলা ৪টা পর্যন্ত ৪ হাজার ৮৩৩ জন বন্দি তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। তবে গত শনিবার পর্যন্ত পুরুষ ৪৪৮ জন, নারী ২৩ জনসহ মোট ৪৭১ জন ভোট প্রদান করেন। পাশাপাশি ১৬ জন বিশেষ বন্দিও ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। গতকাল শেষ দিনে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ২৯৫ জন বন্দি ভোট দিয়েছেন।