জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র রুখতে ভোটের দিন ভোট কেন্দ্রে ফজরের নামাজ আদায় করতে দলীয় নেতা-কর্মীসহ সাধারণ ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই আপনারা ভোট কেন্দ্রে থাকবেন। ফজরের নামাজ ভোট কেন্দ্রে গিয়ে আদায় করবেন। ওখানে গিয়ে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে যাবেন, যাতে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কেউ কিছু না করতে পারেন। শুধু ভোট দিলেই চলবে না, ভোট দিয়ে ভোট বুঝে নিয়ে আসবেন। হিসাব বুঝে আনতে হবে। বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে ধানের শীষের পক্ষে জনগণের রায় চান বিএনপি চেয়ারম্যান। গতকাল দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ছয়টি নির্বাচনি জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন। বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নিয়ে সমালোচনা করে নয়, জনগণের ভাগ্য বদলের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দিয়েই দেশের উপকার করা সম্ভব। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে একটি মহল ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। তাদের লোকজন ভোটারদের কাছে গিয়ে বিভ্রান্ত করছে। বিশেষ করে মা-বোনদের কাছে গিয়ে বিভিন্ন অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। প্রকৃত অর্থে তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো বায়বীয়। আমরা জনগণকে এমন প্রতিশ্রুতি দিতে চাই, যেগুলো মানুষের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
আমরা ভোটারদের এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে চাই না, যা মানুষের সাধ্যের বাইরে। যা মানুষের আওতার ভিতর নয়। সর্বপ্রথম জনসভাটি অনুষ্ঠিত হয় তারেক রহমানের নিজের নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-১৭ আসনের বনানী কামাল আতাতুর্ক মাঠে। এতে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-১৭ এর নির্বাচনি কার্যক্রমের প্রধান সমন্বয়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম, যুগ্ম সমন্বয়ক ফরহাদ হালিম ডোনার, বিএনপি নেতা নাজিম উদ্দিন আলম, কৃষিবিদ শামিমুর রহমান শামীম, যুবদল সভাপতি মোনায়েম মুন্না, ঢাকা উত্তর সিটির সাবেক মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল এবং গুলশান, বনানী, ক্যান্টনমেন্ট, ভাসানটেক ও বাড্ডা থানা বিএনপি ও বিভিন্ন ওয়ার্ড কমিটি নেতারা। অনুষ্ঠানের শুরুতেই এ এলাকার মোরগ মার্কার সংসদ সদস্য প্রার্থী কাজী এনায়েত উল্লাহ ধানের শীষের প্রার্থী তারেক রহমানের পক্ষে তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার ঘোষণা দেন। তিনি তার নেতা-কর্মীদের ধানের শীষের পক্ষে কাজ করার অনুরোধ জানান। প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তারেক রহমান নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন, বিএনপির লক্ষ্য এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করা, যেখানে সব নাগরিক দিন-রাত যে কোনো সময় নিরাপদে চলাফেরা এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারেন। তিনি বলেন, বিদেশগামীদের যেন জমিজমা বিক্রি করতে না হয়, সেজন্য সরকারিভাবে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা হবে। এ ঋণের মাধ্যমে তারা সহজেই বিদেশে যাওয়ার খরচ মেটাতে পারবেন এবং সেখান থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে পরবর্তীতে তা পরিশোধ করতে পারবেন। পরে কলাবাগান ক্রীড়াচক্র মাঠে ঢাকা-১০ আসনের নির্বাচনি জনসভায় অংশ নেন তারেক রহমান। ওই আসনের প্রার্থী শেখ রবিউল আলম রবির সভাপতিত্বে জনসভায় তারেক রহমান বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে বিশ্বাস শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ধারণ করতেন এবং দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ধারণ করেছেন ‘বাংলাদেশই আমাদের প্রথম এবং শেষ ঠিকানা। সব অত্যাচার-নির্যাতনের মধ্যেও তিনি দেশ ছেড়ে যাননি। বলেছেন, এই দেশের মানুষই তাঁর পরিবার।
বিএনপির হাইকমান্ড বলেন, আমরা চাইলে প্রতিপক্ষদের নিয়ে অনেক কথা বলতে পারি। কিন্তু শুধু কথা বললেই কি দেশের বা জনগণের কোনো লাভ হয়? না লাভ হয় না। দেশ ও জনগণের প্রকৃত লাভ তখনই হয়, যখন একটি রাজনৈতিক দলের হাতে থাকে জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও কার্যকর কর্মসূচি। বিএনপি কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে কৃষি কার্ড, মায়েদের তথা গৃহিণীদের পাশে দাঁড়াতে ফ্যামিলি কার্ড চালুর কথা জানান তারেক রহমান। গ্রাম ও শহরের প্রান্তিক, খেটে খাওয়া নারীদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতেই এটি করা হবে। সারা দেশের স্কুলশিক্ষকদের পর্যায়ক্রমে কম্পিউটার প্রদানের মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা নিশ্চিতের কথা বলেন তারেক রহমান। শহর ও গ্রাম সব জায়গায় প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। তারেক রহমান বলেন, প্রায় দেড় কোটির মতো প্রবাসী ভাই-বোনের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় দেশ চলে। তিনি বলেন, তাঁদের হয়রানি কমাতে এবং দেশে ফিরে সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করতে চালু করা হবে ‘প্রবাসী কার্ড’। তারেক রহমান বলেন, মসজিদের ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিন ও অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করেন। বিএনপি সরকার গঠন করলে তাঁদের জন্য সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। বিএনপির আরও অনেক পরিকল্পনা আছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, এগুলোর (পরিকল্পনা) মূল লক্ষ্য হলো মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র আছে, অপচেষ্টা আছে। আমরা দেখেছি, একটি পক্ষের লোকজন জাল ব্যালটের সিল বানাতে গিয়ে ধরা পড়েছে। তারেক রহমান পরে ঢাকা-৮ আসনে (কমলাপুর) পীরজঙ্গী মাজার রোডে, ঢাকা-৯ আসনে মান্ডা তরুণ সংঘ মাঠে, ঢাকা-৫ আসনে যাত্রাবাড়ী শহীদ ফারুক রোডে, ঢাকা-৪ আসনে জুরাইন-দয়াগঞ্জ রোডে, ঢাকা-৬ আসনে ধূপখোলা মাঠে এবং ঢাকা-৭ আসনে লালবাগ বালুর মাঠে আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য রাখেন। এসব জনসভায় তারেক রহমান বলেন, নারীরা জনগোষ্ঠীর অর্ধেক। বেগম খালেদা জিয়া নারীদের জন্য উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা চালু করেন। ফলে নারী শিক্ষা আজ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এখন দরকার তাদের স্বাবলম্বী করা।
মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধাদের ত্যাগের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে পারলেই তাদের রক্তের ঋণ শোধ করা হবে।
তিনি বলেন, দেশের তরুণদের সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে দেশজুড়ে আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করা হবে। এর মাধ্যমে তারা যেন দেশে এবং বিদেশে সম্মানজনক কাজ করে স্বাবলম্বী হতে পারেন এবং দেশের বেকারত্ব ঘোচাতে পারেন।
তারেক রহমান বলেন, এ নির্বাচন শুধু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, এটা দেশ গঠনের নির্বাচন। বিগত ১৬ বছর আমরা দেখেছি, বহু মেগা প্রজেক্ট হয়েছে। যার মাধ্যমে মেগা দুর্নীতি হওয়ায় মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি।
তিনি আরও বলেন, আমাদের গ্রামগঞ্জের হাসপাতালগুলোতে গেলে ওষুধ পাওয়া যায় না। স্কুল-কলেজ ভেঙেচুরে পড়ে যাচ্ছে। রাস্তাঘাট নষ্ট হয়ে গেছে। চলাচল করা যায় না।
এদিকে, উত্তর যাত্রাবাড়ী শহীদ ফারুক সড়কে আয়োজিত জনসভায় তারেক রহমান ঢাকা-৫ আসনের বিএনপি প্রার্থী নবী উল্লাহ নবীর হাতে ধানের শীষ তুলে দিয়ে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি বলেন, নবী উল্লাহ নবীর জনপ্রিয়তা দেখে মনে হচ্ছে তাকে মনোনয়ন দিয়ে বিএনপি ভুল করেনি। মঞ্চের সামনে থাকা নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা সমস্বরে এলাকার গ্যাসসংকটের কথা জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে তারেক রহমান বলেন, আগের সরকার তাদের নিজেদের লোকজন যাতে কমিশন পায় সেজন্য বিদেশ থেকে গ্যাস নিয়ে আসত। কিন্তু দেশের মধ্যে নতুন গ্যাসের খনি অনুসন্ধান করেনি। বাংলাদেশে প্রচুর গ্যাসের খনি আছে। সেই খনি থেকে গ্যাস উত্তোলন করে সংকট মোকাবিলা করা হবে।
ডেমরা-যাত্রাবাড়ী এলাকায় ইপিজেড করার ঘোষণা দেন তারেক রহমান। এ এলাকায় বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো চালু করে নতুন
কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘোষণা দেন তিনি। নবী উল্লাহ নবীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা-৫ আসনের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য এ এলাকায় হাসপাতাল করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।