বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা টেকসই রাখতে ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কার, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গঠন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না হলে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে এবং অর্থনীতি একই জায়গায় ঘুরপাক খেতে থাকবে।’ গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস : এন ইকোনমিক রিফর্ম ফর দি ইলেকটেড গভর্নমেন্ট’ শীর্ষক আলোচনায় এসব কথা বলেন তিনি। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) এবং অস্ট্রেলিয়া সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেড (ডিএফএটি) যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘দারিদ্র্য হ্রাস, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, সামাজিক অগ্রগতিসহ বাংলাদেশের উন্নয়ন অর্জন দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি সাফল্যের গল্প হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পেরেছে দেশ।’ তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই গতি দুর্বল হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কম বিনিয়োগ দক্ষতা, দুর্বল করব্যবস্থা এবং সংস্কারে পর্যাপ্ত মনোযোগের অভাব এর মূল কারণ।’ তাঁর মতে সংস্কার সাধারণত জনপ্রিয় নয় এবং তা বাস্তবায়নে শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সাহসী নেতৃত্ব প্রয়োজন। সংস্কারের অগ্রাধিকার ক্ষেত্র হিসেবে তিনি সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, রাজস্বকাঠামো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ এবং আর্থিক খাতের কথা উল্লেখ করেন। তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন কর্মসংস্থানে। ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ের অনেক গণ আন্দোলনের মূল দাবিই ছিল কর্মসংস্থান।
অথচ সরকারি খাত মোট চাকরিপ্রার্থীর মাত্র ৫ শতাংশকে শোষণ করতে পারে এবং বেসরকারি খাতেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। কর্মসংস্থান ছাড়া প্রবৃদ্ধির কোনো অর্থ নেই, বলেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি জানান, প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বৈষম্যও বেড়েছে। জিনি সহগ প্রায় ০.৫-এ পৌঁছানো আয়ের বৈষম্য বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
তিনি বলেন, এখনো প্রায় ৪০ শতাংশ শ্রমশক্তি কৃষিতে নিয়োজিত, যার বড় অংশই মৌসুমি ও অনানুষ্ঠানিক। সেবা খাত জিডিপির অর্ধেকের বেশি অবদান রাখলেও মানসম্মত চাকরি সৃষ্টি করতে পারেনি। শিল্প খাত, যা তুলনামূলক স্থায়ী ও ভালো বেতনের চাকরি দিতে পারে, সেখানেও কর্মসংস্থান প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের বড় অংশ কম বা আধাদক্ষ কাজে নিয়োজিত থাকায় আয় ও দীর্ঘমেয়াদি সুফল সীমিত থাকছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শ্রমবাজার সংস্কার ও শিল্প সম্প্রসারণের পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দেন ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও দক্ষতার অভাবে নিয়োগদাতারা উপযুক্ত কর্মী পাচ্ছেন না। যুব বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক বেশি, আর যারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে তাদের হার আরও উদ্বেগজনক। কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষার স্তর যত বাড়ছে, বেকারত্বও তত বাড়ছে, এটি মারাত্মক দক্ষতার অসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত, বলেন তিনি।
তিনি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো, ব্যয়ের দক্ষতা ও শাসনব্যবস্থা উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে সামাজিক সুরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তবে কর-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়ায় সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণে আর্থিক সক্ষমতা তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেন।