ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাষ্ট্রের প্রায় সব খাতেই যখন রূপান্তরের আলোচনা চলছে, ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ সংশোধন নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভিতরকার অস্থিরতা। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ একটি মৌলিক আইন এ যুক্তিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এ আইনে বড় ধরনের সংশোধনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, আর্থিক খাত সংস্কারের স্বার্থে এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এ মতবিরোধ এখন আর কেবল নীতিগত আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তা রূপ নিয়েছে প্রকাশ্য প্রতিবাদ ও পদত্যাগ দাবির আন্দোলনে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে পাঠানো এক আধাসরকারি (ডিও) চিঠিতে অর্থ উপদেষ্টা স্পষ্ট করে জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সীমিত রাজনৈতিক বৈধতা ও স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশের মতো একটি মৌলিক আইনে ব্যাপক সংশোধন আনা বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর মতে নির্বাচনের পর দায়িত্ব নেওয়া রাজনৈতিক সরকারের সময় এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণই অধিকতর যুক্তিসংগত। চিঠিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিদ্যমান আইনেই বাংলাদেশ ব্যাংকের অপারেশনাল ও ফাংশনাল স্বাধীনতা যথেষ্ট রয়েছে এবং সরকার নীতিনির্ধারণ বা দৈনন্দিন কার্যক্রমে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে না। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলেই মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ।
খেলাপি ঋণ, একের পর এক ব্যাংক কেলেঙ্কারি, দুর্বল তদারকি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এ বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে, আইনে স্বাধীনতা থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংক আদৌ কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পেরেছে?
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত সংশোধনকে অনেকেই দেখছেন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার একটি কাঠামোগত সুযোগ হিসেবে। সংশোধন প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে গভর্নরের পদমর্যাদা পূর্ণমন্ত্রীর সমপর্যায়ে উন্নীত করা, পরিচালনা পর্ষদে সরকারের প্রতিনিধিত্ব কমানো, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ সদস্য বাড়ানো এবং নিয়োগ-অপসারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছ কাঠামো প্রবর্তন।
গভর্নরের যুক্তি, এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বাড়বে, নীতিগত স্বাধীনতা আরও সুসংহত হবে এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সহজ হবে। তিনি এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২১ সালের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনতা কাঠামোর সুপারিশের কথাও উল্লেখ করেছেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে গভর্নরের পদমর্যাদা বাড়ানোই স্বাধীনতার মূল সমাধান নয়। বরং নিয়োগ ও অপসারণ প্রক্রিয়া কতটা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হচ্ছে, জবাবদিহি কাঠামো কতটা কার্যকর হচ্ছে এসবই প্রকৃত স্বাধীনতার মানদণ্ড। এ কারণেই অর্থ উপদেষ্টা তার চিঠিতে পর্ষদ কাঠামো ও নিয়োগ অপসারণের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা ও অংশীজনদের মতামতের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন।
এদিকে স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব অনুমোদন না দেওয়ায় অর্থ উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। গত সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩০ তলা ভবনের সামনে আয়োজিত প্রতিবাদসভা থেকে এ দাবি জানানো হয়।
অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের ব্যানারে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা অংশ নেন। সংগঠনের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘গত বছরের অক্টোবরের শুরুতেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আদেশ সংশোধনের প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তা এখনো অনুমোদন পায়নি।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘বর্তমান অর্থ উপদেষ্টা নিজে গভর্নর থাকাকালে এ প্রস্তাবের পক্ষে ছিলেন, অথচ এখন তা বাস্তবায়নের প্রয়োজন নেই বলে অবস্থান নিয়েছেন। এ দ্বিমুখী অবস্থানের কারণেই তাঁর পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছে।’
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘দেশের আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর ও সক্ষম কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিকল্প নেই। অথচ বহুলপ্রত্যাশিত বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ সংশোধন অধ্যাদেশ প্রণীত না হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।’