চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের নাম শুনলেই এখন শিল্পের ছবি ভেসে ওঠে। একের পর এক অর্থনৈতিক অঞ্চল আর একটার পর একটা বড় প্রকল্প। সে তালিকায় এবার যোগ হচ্ছে আরেকটি স্পর্শকাতর উদ্যোগ ‘প্রতিরক্ষা অর্থনৈতিক অঞ্চল’। সরকার বলছে, এটি হবে বাংলাদেশের জন্য যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। দেশকে প্রতিরক্ষা পণ্য উৎপাদনে স্বনির্ভর করবে। ড্রোন, সামরিক সরঞ্জাম, সাইবার প্রযুক্তির মতো পণ্য শুধু দেশের চাহিদা মেটাবে না, সঙ্গে রপ্তানির দরজাও খুলবে। কাগজে কলমে এ স্বপ্ন নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে-এ উদ্যোগ সত্যিই পরিকল্পিত ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা, নাকি সরকারের শেষ সময়ে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত?
২৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন জানান, চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে প্রায় ৮৫০ একর জমিতে প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রাথমিকভাবে গোলাবারুদ, যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য সামরিক উপকরণ উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো, তারাই বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে, তবে এখনো কিছুই চূড়ান্ত নয়। প্রতিরক্ষা অর্থনৈতিক অঞ্চল সাধারণ কোনো শিল্পাঞ্চল নয়। এখানে বিনিয়োগ মানেই প্রযুক্তি, নিরাপত্তা আর কূটনীতির জটিল সমীকরণ। সাধারণত এমন প্রকল্পে প্রযুক্তি স্থানান্তর, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি), এমনকি আইনি কাঠামোতেও শিথিলতা প্রয়োজন হয়। সরকারি বক্তব্যে বলা হচ্ছে, তুরস্ক, চীন, জাপান ও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ আগ্রহী। পাশাপাশি আলোচনায় বারবার উঠে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের নাম। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখন পর্যন্ত প্রতিরক্ষা খাতে মার্কিন বিনিয়োগ বা প্রযুক্তি স্থাপনের কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি প্রকাশ্যে আসেনি। এর মধ্যে ড্রোন উৎপাদন ও সংযোজন কারখানা স্থাপন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সরকার-থেকে-সরকার (জিটুজি) পর্যায়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে জ্বালানি, আইসিটি, জাহাজ নির্মাণ ও নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে বিনিয়োগ করেছে। ভবিষ্যতেও আগ্রহ আছে। কিন্তু প্রতিরক্ষা খাত আলাদা। এসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ হয় দুই সরকারের মধ্যে অর্থাৎ জিটুজি। অথবা কোনো দেশের সরকার বা কো¤পানির মধ্যে। এখন পর্যন্ত তেমন কোনো চুক্তির খবর পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্পর্শকাতর প্রতিরক্ষা শিল্পে সরাসরি অন্য দেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেওয়া প্রায় নজিরবিহীন। কারণ তাদের নিজস্ব আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক অস্ত্র পরিবহন নিয়ন্ত্রণ আইন (আইটিআর) ও রপ্তানি প্রশাসন বিধিমালা (ইএআর) অনুযায়ী উন্নত রাডার, কমব্যাট ড্রোনের কোর সফটওয়্যার, মিসাইল গাইডেন্স বা সাইবার-ওয়ারফেয়ার প্রযুক্তি অন্য দেশের হাতে তুলে দেওয়া যায় না। সর্বোচ্চ যা হয় লাইসেন্সভিত্তিক অ্যাসেম্বলি, লো-টেক যন্ত্রাংশ উৎপাদন, কিংবা তথাকথিত ‘ব্ল্যাক বক্স’ প্রযুক্তি। অর্থাৎ কারখানা থাকবে বাংলাদেশে, কিন্তু প্রযুক্তির চাবিকাঠি থাকবে বিনিয়োগকারীর হাতে। এমনকি উৎপাদিত পণ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তাদের অনুমতি প্রয়োজন হতে পারে। এখানেই জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নটি সামনে আসে।
বিশ্লেষকদের মতে বিনিয়োগকারীর নাম ও চুক্তির শর্ত প্রকাশ না করে প্রতিরক্ষা অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করলে ঝুঁকি বাড়ে। প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, দায়দায়িত্ব কার, লাভ ভাগ হবে কীভাবে এ বিষয়গুলো পরিষ্কার না হলে প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) সভাপতি আ ন ম মুনীরুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সাধারণ বিনিয়োগ এবং প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। অথচ মিরসরাইয়ের প্রতিরক্ষা অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে কতটুকু সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) করা হয়েছে, কিংবা এর বিস্তৃতি কতটুকু হওয়া উচিত সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের একটি স্পর্শকাতর প্রকল্পে স্বাভাবিকভাবেই অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি থেকেই যায়।’
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পর কেয়ারটেকার সরকার সাধারণত কেবল রুটিন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে থাকে। কিন্তু একেবারে অন্তিম মুহূর্তে এসে অন্তর্বর্তী সরকার এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা অত্যন্ত অযৌক্তিক ও প্রশ্নবিদ্ধ।
মিরসরাইয়ে প্রতিরক্ষা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের সিদ্ধান্তটি বিশেষভাবে প্রশ্নসাপেক্ষ। এসব অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকার বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’