ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোটাধিকার প্রয়োগের উদ্দেশ্যে রাজধানী ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন সাধারণ মানুষ। ভোট দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘ ছুটিতে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটাতে অনেকেই ছুটেছেন নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায়। যদিও এই ঘরমুখী মানুষের যাত্রাকে কেন্দ্র করে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাবে সড়কে তৈরি হয়েছে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা। বাসের সংকট ও তীব্র যানজটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ঘরমুখী মানুষ। এর মধ্যেই পরিবহনমালিক ও শ্রমিকদের বিরুদ্ধে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
বাসের টিকিট না পেয়ে অনেক যাত্রীকে ট্রাক ও পিকআপে ঝুঁকি নিয়ে যাত্রা করতে দেখা গেছে। গতকাল সকাল থেকে সায়েদাবাদ, গাবতলী, কল্যাণপুর, মহাখালী ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় ঘুরে বাসের জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রীদের তীব্র ভিড় দেখা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক বাস এলেও যাত্রী তুলছে না, আবার কোথাও যাত্রী তুললেও অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। আর হঠাৎ করেই গণপরিবহন সংকট তৈরি হওয়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে রাজধানীবাসীকেও। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে সরকার আজ (১১ ফেব্রুয়ারি) বুধবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। কাল বৃহস্পতিবার আগে থেকেই সাধারণ ছুটি হিসেবে ঘোষিত ছিল। এ ছাড়া শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে ১০ ফেব্রুয়ারি বিশেষ ছুটি। ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি শুক্র ও শনিবার হওয়ায় দীর্ঘ ছুটি পেয়েছেন কর্মজীবীরা। এর ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে গ্রামের বাড়ির দিকে ছুটছেন তারা। গতকাল বিকাল ৪টার দিকে সরেজমিন মহাখালী বাস টার্মিনালে ঘরমুখী মানুষের তীব্র ভিড় দেখা গেছে। প্রচুরসংখ্যক যাত্রী দেখা গেলেও বাসের সংখ্যা ছিল খুবই কম। কোনো একটি বাস এলে তাতে ওঠার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে মানুষ। নারী-শিশুসহ অনেক যাত্রী কয়েক ঘণ্টা ধরে বাসের অপেক্ষা করছে বলে জানিয়েছেন। অভিযোগ করেছেন বাড়তি ভাড়া না দিলে বাসে ওঠানো হচ্ছে না। এদিকে মহাখালী থেকে উত্তরাগামী সড়কের দুপাশেই ঘরমুখী মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। লাগেজ-ব্যাগ নিয়ে অপেক্ষায় থাকা অনেক বয়স্ক নারী ও শিশুকে রাস্তার পাশে ফুটপাতে বসে থাকতেও দেখা যায়। ছোট পিকআপ-ট্রাকে করেও বাড়ি ফিরতে দেখা গেছে অনেককে। মহাখালী বাস টার্মিনালে রাজশাহী যাওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকা নাসরিন আক্তার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দুপুর ১২টার দিকে এসেছি টার্মিনালে।
বাচ্চা নিয়ে কষ্ট হচ্ছে। বাসই পাওয়া যাচ্ছে না। আবার সেটা আসছে সেটার ভাড়া আকাশছোঁয়া। এই মহাখালী থেকে সায়েদাবাদ পর্যন্ত সর্বোচ্চ সাড়ে ৭০০ টাকা ভাড়া হলেও কোনো কোনো বাসে ১৫০০ টাকা ভাড়া চাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘এবার অনেক দিন পর ভোট দিতে পারব। তাই ভাড়া বেশি দিয়েও যেতে চাচ্ছি।’
এর আগে বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে গিয়েও যাত্রীদের প্রচণ্ড উপস্থিতি দেখা গেছে। এখানে যাত্রীর তুলনায় বাসের সংখ্যা ছিল কম। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে বরিশালগামী যাত্রী আবুল হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সায়েদাবাদ থেকে বরিশালের ভাড়া সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা। আজকে ৮০০ টাকা দাবি করেছে। বলছে দাঁড়িয়ে গেলে ৪০০ টাকায় নিয়ে যাবে। তিনি বলেন, ‘ভোট উপলক্ষে টানা চার দিন ছুটি পেয়েছি। পরিবার নিয়ে বাড়ি যাব। তাই বাধ্য হয়েই বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে।’
এদিকে দুরপাল্লার বাসের সংকট নিরসন ও বাড়তি ভাড়ার আশায় রাজধানীতে চলাচলকারী অনেক গণপরিবহন রাজধানী ছেড়ে গিয়েছে ঢাকার আশপাশের জেলায়। আর এতেই হঠাৎ করেই রাজধানীতেই সৃষ্টি হয়েছে গণপরিবহন সংকট। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে নগরবাসীকে। রাজধানীর কুড়িল এলাকার বাসিন্দা আবদুল্লাহ বলেন, ‘সকাল ৮টার দিকে কুড়িল বিশ্বরোড এলাকা থেকে শাহবাগ যাওয়ার জন্য প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ওই সড়কে নিয়মিত চলাচলকারী কোনো বাসের দেখা পাইনি। পরে মোটরসাইকেল ও সিএনজি অটোরিকশায় যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। তবে ভাড়া চেয়েছে তিন-চার গুণ বেশি। রাইড শেয়ারিং অ্যাপসে অনেক চেষ্টা করেও কোনো রাইডার পাইনি।’
যানজট-দুর্ভোগ মহাসড়কে : এদিকে প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরেও বাড়ি ফেরার দুর্ভোগের খবর পাওয়া গেছে। আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, টানা চার দিনের ছুটি থাকায় শিল্পাঞ্চল গাজীপুরের মহাসড়কে ঘরমুখী মানুষের ঢল নেমেছে। যাত্রীর চাপ, যত্রতত্র ওঠানামার ফলে গতকাল সকাল থেকেই ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগে মহাসড়ক অবরোধ করে দুই ঘণ্টা বিক্ষোভ করেছেন যাত্রীরা।
রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটিতে ঘরমুখী মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে। গতকাল সকাল থেকে ফেরিঘাটে মোটরসাইকেল, যাত্রীবাহী বাস, মাইক্রোবাসে করে ফেরিঘাট দিয়ে ঘরে ফিরছেন মানুষ। দীর্ঘদিন পর এমন ভিড় দেখে ঘাট এলাকার ব্যবসায়ীদের মাঝে খুশির আমেজ বিরাজ করছে।
সাভার প্রতিনিধি জানান, অতিরিক্ত বাসভাড়া আদায়ের অভিযোগে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক অবরোধ করেছেন পোশাকশ্রমিক ও ঘরমুখী মানুষেরা। গতকাল সকাল ৮টার দিকে নবীনগর-চন্দ্রা সড়কের আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকার সড়ক অবরোধ করেন তারা। অবরোধকারীরা জানান, গতকাল সোমবার পোশাক কারখানার শ্রমিকদের শেষ কর্মদিবস ছিল। তাই শ্রমিকরা অফিস শেষে গ্রামের বাড়িতে ফিরতে শুরু করেন। সেই সুযোগে বাসের চালক ও হেলপাররা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ ও ন্যায্য ভাড়ার দাবিতে এই অবরোধ বলে জানান তারা।
মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, নির্বাচনের ছুটিকে কেন্দ্র করে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন পয়েন্টে যাত্রীদের ভোগান্তির অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে নিমতলা, হাসাড়া, ষোলঘর ও শ্রীনগর যাত্রীছাউনি এলাকায় বাস থামিয়ে যাত্রী না নেওয়া এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন সাধারণ যাত্রীরা। গতকাল সকাল থেকে এসব পয়েন্টে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক যাত্রী গাড়ি না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।