যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সই করা ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড’ কেবল একটি বাণিজ্য চুক্তি নয়; এটি কার্যত দেশের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও নীতিনির্ধারণ কাঠামো পুনর্গঠনের রোডম্যাপ। চুক্তিতে পণ্যের শুল্ক ছাড়ের বিষয়টি যতটা আলোচিত, তার চেয়েও বড় অংশজুড়ে রয়েছে শ্রম আইন, কৃষিনিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল নীতি, বিনিয়োগ নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট শর্তাবলি। যেগুলো বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে বড় ধরনের সংস্কারের পথে হাঁটতে হবে।
চুক্তিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, এখানে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বাংলাদেশের ওপর দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা অনেক বেশি। বাংলাদেশের নাম যেখানে এসেছে ২০৫ বার, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নাম এসেছে ৫৯ বার। বিশ্লেষকদের মতে, এটি চুক্তির শক্তির ভারসাম্যকেই স্পষ্ট করে।
এ চুক্তির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রাপ্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যে পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করেছে। কিন্তু বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, ১ শতাংশ শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে যে পরিমাণ নীতিগত ছাড় ও আমদানি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা তুলনামূলকভাবে অনেক বড়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে বাংলাদেশের আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ধাপে ধাপে তুলে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিছু পণ্যে চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুল্ক শূন্যে নেমে আসবে, আবার কিছু ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১০ বছরের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে কোনো ধরনের কোটা আরোপ করা যাবে না। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এতে দেশি শিল্প ও কৃষিপণ্য অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে, বিশেষ করে যেসব খাত এখনো সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল। চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় বাংলাদেশের আমদানি প্রতিশ্রুতি সবচেয়ে স্পষ্ট। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মাধ্যমে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার অভিপ্রায়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানি এবং বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য কেনার পরিকল্পনা চুক্তিতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ আছে।
জ্বালানি আমদানির সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ১৫০০ কোটি ডলার, কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে আরও ৩৫০ কোটি ডলার। এর সঙ্গে সামরিক সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগও যুক্ত হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এসব প্রতিশ্রুতি বাণিজ্যঘাটতি কমানোর বদলে উল্টো বাড়িয়ে দিতে পারে, বিশেষ করে যদি একই সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়ে। চুক্তির কৃষি অধ্যায়ে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) ব্যবস্থার স্বীকৃতি দিতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দেওয়া খাদ্য ও কৃষিপণ্যের সনদ বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য হিসেবে গণ্য হবে।
এ ছাড়া জৈব প্রযুক্তিপণ্য (জিএম পণ্য) আমদানির ক্ষেত্রেও বিজ্ঞান ও ঝুঁকিভিত্তিক নীতির কথা বলা হয়েছে, যাতে অতিরিক্ত অনুমোদন বা লেবেলিংয়ের সুযোগ সীমিত থাকে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে আমদানি সহজ হলেও দেশীয় কৃষক, বীজ বাজার ও দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
চুক্তিতে শ্রম অধিকার নিয়ে বিস্তৃত ও বাধ্যতামূলক শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। বাধ্যতামূলক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা এবং ইপিজেডেও শ্রম আইন কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
একদিকে এটি শ্রমমান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে শিল্প উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া কঠোর শর্ত বিনিয়োগ ব্যয় বাড়াতে পারে। পরিবেশ খাতেও একই ধরনের দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষা আইন কার্যকর করতে হবে, তবে এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না, যা বাণিজ্যে ‘পরোক্ষ বাধা’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এ চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত ও সংবেদনশীল অংশ হলো ডিজিটাল বাণিজ্য ও জাতীয় নিরাপত্তা অধ্যায়। বাংলাদেশকে আন্তসীমান্ত তথ্য প্রবাহে বাধা না দেওয়ার অঙ্গীকার করতে হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির ওপর বৈষম্যমূলক ডিজিটাল কর আরোপ করা যাবে না। একই সঙ্গে সমুদ্রবন্দর, লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক ও বাণিজ্যিক জাহাজে ব্যবহৃত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশকে।
বিশ্লেষকদের মতে, এতে বাণিজ্যের সঙ্গে নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির বিষয়গুলো সরাসরি যুক্ত হয়েছে, যা ভবিষ্যতে নীতিগত স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ চুক্তি বাংলাদেশকে বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থায় আরও গভীরভাবে যুক্ত করতে পারে। তবে শুল্কে সীমিত ছাড়ের বিপরীতে যে পরিমাণ সংস্কার, আইন পরিবর্তন ও আমদানি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য কতটা ভারসাম্যপূর্ণ, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। চুক্তির সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ধরন, আলোচনার মাধ্যমে শর্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ এবং দেশি শিল্প ও কৃষিকে সুরক্ষার সমান্তরাল কৌশল গ্রহণের ওপর।