দেশের শিক্ষা খাতে দৃশ্যমান কোনো অর্জন নেই ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের। দেড় বছরে তেমন অর্জন না থাকলেও ছিল সমালোচনা। শেষ সময়ে একসঙ্গে অনেক কিছু নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আসলে তেমন কিছুই করতে পারেননি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা। ফলে ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবকসহ শিক্ষার বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের ক্ষোভ বেড়েছে অনেক। ২০২৪-এর গণ অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী এ আমলে ছাত্র-শিক্ষকদের বড় একটি সময় পার হয়েছে রাজপথে দাবি আদায়ের আন্দোলনে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার মানোন্নয়নে অরাজনৈতিক এ সরকারের অনেক কিছুই করার ছিল। কিন্তু প্রত্যাশার কানাকড়িও পূরণ হয়নি।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল শিক্ষা আইনের। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের একেবারে শেষ সময়ে এসে শিক্ষা আইনের খসড়া প্রকাশ করা হয়। এ খসড়ায় মতামতের জন্য মাত্র ছয় দিন সময় দিয়ে তড়িঘড়ি করে আইন প্রণয়নের চেষ্টা হয়েছিল। তবে এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সমালোচনার মুখে শিক্ষা আইন প্রণয়ন থেকে সরে আসে শিক্ষা প্রশাসন।
জানুয়ারির শুরুতে ছাত্রছাত্রীরা নতুন বই হাতে পাওয়ার কথা থাকলেও সংশ্লিষ্টদের নানা অব্যবস্থাপনায় বই ছাপাতে ও পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। সব বই হাতে পেতে লেগে যায় চলতি ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ছেদ পড়ে।
গত অক্টোবরের পর থেকে শিক্ষার সব থেকে বড় দপ্তর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের নিয়মিত মহাপরিচালকের পদ শূন্য রয়েছে। দীর্ঘ সময়েও এ পদে নিয়োগ দিতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক কাজই থমকে রয়েছে। বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্বের মহাপরিচালক দিয়ে কোনোমতে কাজ চালিয়ে নিচ্ছে সরকার।
শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরারের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন সবচেয়ে বেশি সমালোচনার সম্মুখীন হয় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি নিয়ে। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাদ রেখে ১ হাজার ৭১৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির চেষ্টা করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। আর আবেদনকারী ৩ হাজার ৬১৫টি প্রতিষ্ঠান থেকে ‘যোগ্য’ প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের বড় কার্যক্রম শিক্ষা মন্ত্রণালয় শেষ করে মাত্র ছয় কার্যদিবসে। যা অনেককে অবাক করে। মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে কাম্য যোগ্যতা না থাকা অনেক প্রতিষ্ঠানকে এমপিও দেওয়ার অপচেষ্টার অভিযোগ ওঠে। তড়িঘড়ি করে এসব প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে অর্থ বিভাগের সম্মতি প্রদানের জন্য অর্থ সচিব বরাবর চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এমপিওভুক্তির নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে আটকে যায় এমপিওভুক্তির এই বিতর্কিত আয়োজন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিলের আগের রাতে গত বছরের ডিসেম্বরে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর-প্রতিষ্ঠানের ৪৭৫ জন ক্যাডার কর্মকর্তার বদলি করা হয়। বৃহৎ এ বদলি প্রক্রিয়ায় বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। আলোচিত এই বদলি কারবারে শিক্ষা উপদেষ্টা ও সচিবের দপ্তর এবং কলেজ শাখার বিভিন্ন কর্মকর্তার নাম উঠে আসে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসে এক দিনে এত বিপুলসংখ্যক বদলির নজিরবিহীন এই রাতটিকে এরই মধ্যে অনেকেই ‘বদলির চাঁদরাত’ নামে আখ্যা দেন। এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো বছরেই আলোচনা ছিল ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি নিয়ে। রাজধানীর বৃহৎ সাতটি কলেজ নিয়ে ছাত্রছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা প্রণয়ন করে। এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশের খসড়া প্রকাশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সর্বশেষ গত সোমবার ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। তবে ছাত্রছাত্রীরা সাত কলেজ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আন্দোলন করলেও এই সাত কলেজকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর মতো ‘সংযুক্ত কলেজ’ হিসেবেই রাখা হয়েছে। এ নিয়েও শিক্ষার্থীদের অনেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মো. জিয়াউল কবির দুলু বলেন, অন্তর্বর্তী শিক্ষা উপদেষ্টার কাছে শিক্ষার উন্নয়নে অনেক প্রত্যাশা ছিল আমাদের। কিন্তু সেসবে গুড়েবালি হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি, শিক্ষা আইন ছাড়াও গুরুত্বপুর্ণ নানা বিষয়ে তিনি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন।