ভোটের দিন সড়ক মহাসড়কে মোটরসাইকেলসহ পাঁচ ধরনের যান চলাচলে ছিল নিষেধাজ্ঞা। নানা কারণে অনেকে প্রাইভেট কারও রাস্তায় বের করেননি। ফলে সড়ক ছিল পুরো ফাঁকা। কিন্তু এই ফাঁকা সড়কে রাজত্ব ছিল ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার। রাজধানীর অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক সবখানে গতকাল দাপিয়ে বেড়িয়েছে রিকশাগুলো। মূলত এগুলোতে ভোটাররা করেছেন যাতায়াত। তীব্র গতির কারণে কয়েক স্থানে এগুলো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনাও ঘটিয়েছে। গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ উপলক্ষে আগে থেকেই সারা দেশে পাঁচ ধরনের যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ১১ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) মধ্যরাত ১২টা থেকে গতকাল মধ্যরাত ১২টা পর্যন্ত ট্যাক্সিক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচল বন্ধ ছিল। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) মধ্যরাত ১২টা থেকে ভোট গ্রহণের পরদিন শুক্রবার মধ্যরাত ১২টা পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সবমিলিয়ে কর্মজীবীদের জন্য ছিল লম্বা ছুটি। এ কারণে অনেকে যান গ্রামের বাড়ি। ফলে ঢাকার সড়ক ছিল যেকোনো ঈদের সময়ের মতো বেশি ফাঁকা।
অন্যান্য নির্বাচনের সময় ভোটের দিন অনেককিছু বন্ধ থাকে। এবার ভোটের আগের দিন থেকে যান চলাচল বন্ধ ছিল, পরেও দুই দিন সরকারি ছুটি। ঢাকার দোকানপাটও বন্ধ রাখা হয়। ভোটের দিন সহিংসতা হতে পারে- এমন আশঙ্কায় বেশির ভাগ রাজধানীবাসী নিজেদের ব্যক্তিগত গাড়িও রাস্তায় বের করেনি। এদিন সড়কে আইনশৃঙ্খলা ও নির্বাচন কমিশনের অনুমতিপ্রাপ্ত হাতেগোনা গাড়িগুলো চলেছে। গণপরিবহন বন্ধ না থাকলেও রাজধানীর সড়কে গণপরিবহন চলেনি। এম বাস্তবতায় একমাত্র ভরশা হয়ে উঠেছিল অটোরিকশা। সরেজমিনে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, ঝিগাতলা, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর, এলাকা ঘুরে চলতে দেখা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যানবাহন, বিভিন্ন গণমাধ্যমের গাড়ি, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গাড়ি আর হঠাৎ দু-একটি অ্যাম্বুলেন্স। এর বাইরে সব সড়কে ছিল শুধু রিকশা আর রিকশা। পিচঢালা ফাঁকা সড়কে যতদূর চোখ গেছে শুধু রিকশা সারিই দেখা গেছে। কোথাও পাল্লা দিয়ে তীব্র গতিতে প্রধান সড়কগুলোতে যাতায়াত করেছে এই দুর্বল বাহনগুলো। রাজধানীর কয়েক স্থানে তীব্র গতির কারণে এগুলো উল্টে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। উড়োজাহাজ বিজয় সরণির মধ্যখানে দুপুরে একটি অটোরিকশা ঘুরাতে গিয়ে দুই যাত্রী নিয়ে উল্টে পড়ে। এতে এক নারী যাত্রী রাস্তাতেই বসে ব্যথায় কাতরাতে থাকেন। বিকাল ৩টার দিকে খামারবাড়ীতে দুই অটোরিকশার মুখোমুখি ধাক্কা লেগে সামনের অংশ বেঁকে যায়। সকালে ধানমন্ডি-জিগাতলা সড়কে এরকম অটোরিকশার অনেকগুলো দুর্ঘটনা ঘটায়। এ ছাড়াও রামপুরা প্রধান সড়কে, কারওয়ান বাজার প্রধানসড়ক এবং টেকনিক্যাল মোড়েও বিচ্ছিন্ন অটোরিকশা উল্টে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় কেউ মারাত্মক আহত হননি। লালমাটিয়া আড়ং মোড়ে অটোরিকশা চালক হাসিব মিয়া বলেন, ‘এখন সড়কে পায়ে চালানো রিকশা খুব একটা নেই। তাই ছুটির দিনে অটোরিকশায় একটু আয়ও বেশি হয়।’ এসব যানে দুর্ঘটনা হয়- তাও স্বীকার করেন তিনি।
ভোট কেন্দ্র থেকে ধানমন্ডি রাপাপ্লাজার সামনে যাত্রী নামাচ্ছিলেন রিকশাচালক হারুন। তিনি বলেন, ‘সড়কে গাড়ি নেই, তাই আমাদের আয় বেশি।’ দুর্ঘটনার কথা বললে তিনি উল্টো বলেন, ‘ভাগ্যে থাকলে সব গাড়িতেই হবে। যাত্রীদের তো আমরা জোড় করে উঠাই না।’ সঙ্গে থাকা যাত্রী ভাড়া দিতে দিতে বলেন, ‘দোষটা আমাদেরই। আমরা এসব যানে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নিজেদের জীবন শঙ্কার কথা ভাবি না। সড়কে এসব প্রায়ই উল্টে যায় দেখেও আমরা চলাচল করি। তবে দিনদিন এসব বেড়ে যাওয়ার কারণে পায়ের রিকশা পাই না বলে বাধ্য হয়ে উঠি।’ অনেক জায়গায় নিয়মিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়াও নিয়েছেন চালকরা। কলাবাগানে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালক শহিদ মিয়া জানান, ‘যানজট নেই। যাত্রী যা আছে ইনকাম বেশ হচ্ছে। এমন দিনে একটু বাড়তি ভাড়া না হলে পোষায় না।’ বাংলাদেশ বাস-ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানিয়েছেন, ‘নির্বাচনের দিন দেশে দূরপাল্লার বাস চলাচলে নিষেধাজ্ঞা ছিল না, তবে কর্মীদের ছুটির কারণে অধিকাংশ সার্ভিস বন্ধ থাকতে পারে। সবাই ছুটিতে বাড়ি গেছে, কারণ তাদেরও পরিবার বা স্বজন আছে। ভোট শেষে পরের রাত থেকে বাস সার্ভিস চালু হবে।’