চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণ অভ্যুত্থানের হটস্পট হিসেবে পরিচিত রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, শনিরআখড়া, দনিয়া, রায়েরবাগ এলাকার ভোট কেন্দ্রে দিনভর উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি ভোটারদের অভিযোগও ছিল অনেক। সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণের হার ও ভোটার উপস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও দুপুর থেকে উপস্থিতি কমার পাশাপাশি ধীরগতির অভিযোগও পাওয়া যায়। দীর্ঘ লাইনে থেকে ভোট না দিয়েও যেতে দেখা গেছে বেশ কিছু ভোটারকে। নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরে অনেকে যেমন স্বস্তি প্রকাশ করেছেন, পাশাপাশি বুথ খুঁজে না পেয়ে ভোট না দিয়ে চলে গেছেন কেউ কেউ। অধিকাংশ কেন্দ্রে ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা ও হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী ছাড়া অন্যদের এজেন্ট পাওয়া যায়নি। গতকাল ঢাকা-৪ ও ঢাকা-৫ আসনের মধ্যে থাকা এই এলাকার অন্তত ১২টি ভোট কেন্দ্রে সরেজমিন এমন চিত্রই পাওয়া গেছে। এই কেন্দ্রগুলোর ভিতরের পরিবেশ ঠিক থাকলেও বাইরের ছিল বিশৃঙ্খলা। প্রবেশমুখে জটলা থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভোটাররাও। সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি এলে পরিস্থিতি কিছুটা ঠিক হলেও তারা চলে গেলে আবারও একই অবস্থা। সকাল ৮টায় দনিয়া কলেজে থাকা তিনটি কেন্দ্রের সামনেই ১০ থেকে ১২ জন করে ভোটারের লাইন দেখা গেছে। পরে বেলা পৌনে ১টায় এই কলেজের একটি কেন্দ্রে আবারও গেলে প্রিসাইডিং অফিসার জানান ১২টা পর্যন্ত প্রায় ২৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। বেলা ২টার পর থেকে ওই কেন্দ্রের সামনে আর লাইন দেখা যায়নি। এই কেন্দ্রে ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা ও হাতপাখা প্রতীকের বাইরে আর কারও এজেন্ট পাওয়া যায়নি। যাত্রাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সকাল ৯টায় গিয়ে বুথের সামনে লাইন দেখা গেছে। এই কেন্দ্রে ৭২ বয়স বয়সি আকলিমা বেগম নির্বিঘ্নে ভোট দিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘কোনো ঝামেলা ছাড়াই ভোট দিয়েছি।’ এখানকার মহিলা ভোট কেন্দ্রে ২ হাজার ৫৮৩টি ভোটের মধ্যে সকাল সোয়া ৯টা পর্যন্ত ১৬০ ভোট কাস্ট হয়েছে বলে জানান প্রিসাইডিং অফিসার। এরপর এই স্কুলে থাকা পুরুষ কেন্দ্রে ভোট দেন বিএনপি প্রার্থী নবীউল্লাহ নবী। তিনি ভোট দিয়ে জয়ের বিষয়ে আশা প্রকাশ করেন। দুপুর ১২টার দিকে দনিয়া একে স্কুলে (পুরাতন) প্রবেশের সময়ই গেটেই ষাটোর্ধ্ব হোসনে আরাকে ক্ষুব্ধ অবস্থায় দেখা যায়। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার ভোটার নম্বর ২৬৯। তবে এখানকার বুথে গিয়ে দেখি অন্যজনের নাম। অনেকক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ভোট দিতে পারলাম না।’
একই ধরনের ঘটনায় অন্তত ২৫ জন এই কেন্দ্রে থেকে ভোট না দিয়ে ফিরে গেছেন বলে জানিয়েছেন গেটে থাকা আনসার সদস্য। এই স্কুলে থাকা একটি নারী ভোট কেন্দ্রে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ৪০০ ভোট কাস্ট হয়েছে বলে জানান প্রিসাইডিং অফিসার। এখানে মোট ভোটার ২ হাজার ১৭৫। ভোটগ্রহণে ধীরগতির অভিযোগ করেন ভোটাররা। বেলা ৩টার দিকে এই কেন্দ্রে গিয়ে বুথের সামনে কোনো লাইন দেখা যায়নি।
দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে দনিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজে থাকা পুরুষ ভোট কেন্দ্রে গেলে প্রিসাইডিং অফিসার জানান, দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২ হাজার ৬৪৪ ভোটের মধ্যে ৯৫০টি গ্রহণ করা হয়। এই কেন্দ্রের ৫০২ নম্বর রুমের সামনে দেখা যায় তরুণ ভোটারদের লম্বা লাইন। সদস্য এমএসসি পাস করা ইয়ারুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এক ঘণ্টারও বেশি সময় লাইনে আছি। এর পরেও কষ্ট নেই। এখানে যাঁরা লাইনে আছেন সবাই একসঙ্গে অভ্যুত্থানের যোদ্ধা ছিলাম। নতুন দেশ গড়তে ভোট দিতে পারব, তাই ভালো লাগছে।’ বেলা পৌনে ৩টার দিকে রায়েরবাগ এলাকার মোহাম্মদবাগ এবিএম গ্র্যাজুয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি কেন্দ্রে ২ হাজার ৬৮২টি ভোটের মধ্যে বেলা সোয়া ১টা পর্যন্ত ১ হাজার ১১৮টি ভোট গ্রহণের কথা জানান প্রিসাইডিং অফিসার। তবে ওই সময় এই কেন্দ্রের প্রায় সব বুথই ছিল খালি। এই স্কুলের আরেকটি কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার জানান ২৬৫১ ভোটের মধ্যে ১১৩০ ভোট কাস্ট হয়েছে। এই কেন্দ্রের কয়েকটি বুথের সামনে লাইন থাকলেও ধীরগতিতে ভোট গ্রহণের অভিযোগ করেন ভোটাররা। এই এলাকার হাজী শরিয়ত উল্লাহ আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের মহিলা ভোট কেন্দ্রে বেলা ৩টার দিকে ৪৪৭২ ভোটের মধ্যে ১ হাজার ৮২০ ভোট কাস্ট হওয়ার কথা জানান প্রিসাইডিং অফিসার। এই কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজল মোল্লা অভিযোগ করে বলেন, ‘দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভালো ভোট হয়েছে। এরপর থেকে ভোট গ্রহণ কর্মকর্তারা ধীরগতিতে ভোট নিচ্ছেন। আমরা বারবার অভিযোগ করেও ফল পাইনি।’ এখানে রাবেয়া নামে একজন নারী ভোটার অভিযোগ করেন আড়াই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও ভোট দিতে পারেননি। ভোট না দিয়েই ফিরে যাচ্ছেন তিনি।