নির্বাচন-পরবর্তী গতকাল বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। মুন্সিগঞ্জে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ভোলায় জামায়াত কর্মীকে রড দিয়ে পিটিয়ে আহত করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে দফায় দফায় হামলা-ভাঙচুর, মহেশপুরে প্রেস ক্লাবে হামলা ও ভাঙচুর এবং সদরে দোকানপাটে হামলা হয়েছে। মেহেরপুরে হামলায় জামায়াতের তিন কর্মী আহত হয়েছেন। পটুয়াখালীর বাউফলে বিএনপি কর্মীদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট হয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েক জেলায় হামলা-সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
মুন্সিগঞ্জ : মুন্সিগঞ্জে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় মো. জসিম নায়েব (৩০) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহিউদ্দিনের সমর্থক ছিলেন। গতকাল দুপুরে সদর উপজেলার আধারা ইউনিয়নের চর আবদুল্লা গ্রামে এ সহিংসতার ঘটনা ঘটে। তিনি ওই এলাকার মাফিক নায়েবের ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল দুপুরে ধানের শীষ প্রতীকের সমর্থকরা ফুটবল প্রতীকের সমর্থক মো. জসিম নায়েবের বাড়িতে গিয়ে গালিগালাজ করেন। একপর্যায়ে তারা জসিম নায়েবকে বেধড়ক মারধর করেন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্বজনরা তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তিনি মারা যান। নিহতের বড় ভাই মো. মশিউর রহমান বলেন, ডা. নাসিরের ছেলে সাকিবের নেতৃত্বে প্রায় দুই শতাধিক ধানের শীষের সমর্থক তাদের বাড়িতে গিয়ে তার ভাইকে গালিগালাজ করেন। একপর্যায়ে তারা আমার ভাইকে বেধড়ক মারধর করেন। ওই হামলার পর তার অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত ঢাকায় নেওয়া হয়, তবে শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি।
মুন্সিগঞ্জ সদর সার্কেলের (সদর-গজারিয়া) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া মুন্সিগঞ্জ সদরে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় অন্তত ১৫ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গতকাল উপজেলার আধারা, শিলই, চরকেওয়ার ও মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে এসব হামলার ঘটনা ঘটে।
ভোলা : ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর এক কর্মীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে বিএনপি প্রার্থীর লোকজনের বিরুদ্ধে। গতকাল মাগরিবের নামাজের পর উপজেলার কুঞ্জেরহাট যাওয়ার পথে মিঝির বাজার এলাকায় অটোরিকশা থেকে নামিয়ে তাকে রড দিয়ে পিটিয়ে আহত করা হয়। বর্তমানে তিনি বোরহানউদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। মারধরের শিকার ব্যক্তির নাম মো. ইসমাইল। তিনি কাচিয়া ইসলামি দাখিল মাদ্রাসার সুপার মাওলানা আখতারুজ্জামানের বড় ছেলে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে তিনি ঢাকা থেকে বাড়ি এসেছিলেন।
ঝিনাইদহ : ঝিনাইদহে তিনটি আসনে নির্বাচন-পরবর্তী হামলা, ভাঙচুর ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ঝিনাইদহ-৪ আসনের কালীগঞ্জে হামলায় স্বতন্ত্র (বিএনপি বিদ্রোহী) কাপ-পিরিচ প্রতীকের প্রায় ২৮ জন সমর্থক ও ধানের শীষ প্রতীকের দুজন সমর্থক আহত এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনি অফিস ভাঙচুর করা হয়েছে। আহতদের কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ ও যশোর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঝিনাইদহ-৩ আসনের মহেশপুর উপজেলা শহরে অবস্থিত প্রেস ক্লাবেও হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করার ঘটনা ঘটেছে।
মেহেরপুর : মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় জামায়াতে ইসলামীর তিন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। গতকাল সকালে জোড়পুকুরিয়া বাজারে এ ঘটনা ঘটে।
পটুয়াখালী : পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার পর জামায়াতের লোকজন বিএনপি, যুুবদল, ছাত্রদলসহ বিএনপি কর্মী-সমর্থকদের বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, দলীয় কার্যালয়ে হামলা ভাঙচুর করেছে। গতকাল বিকালে উপজেলা বিএনপি দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করা হয়।
বাউফল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আতিকুল ইসলাম বলেন, কয়েকটি জায়গায় হামলা, ভাঙচুর ও মারধরের কথা শুনে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিশোরগঞ্জ : কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল এবং পরাজিত ধানের শীষের প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল বেলা ১১টার দিকে হুমায়ুনপুর গ্রামে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।
যশোর : যশোরের চৌগাছায় জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের ছুরিকাঘাতে মোহাম্মদ বাবু (৪৫) নামের এক বিএনপি নেতা গুরুতর আহত হয়েছেন। তাকে প্রথমে চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে যশোর জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। আহত মোহাম্মদ বাবু চৌগাছা উপজেলার ফুলসারা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তার বাড়ি ফুলসারা ইউনিয়নের চারাবাড়ী গ্রামে।
নেত্রকোনা : নেত্রকোনার পূর্বধলায় বিজয়ী জামায়াত প্রার্থীর সমর্থকরা আনন্দ মিছিল করে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে গিয়ে বক্তব্য দেওয়ার পর কথা কাটাকাটির জেরে বিএনপি কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়েছে। এ সময় একজনের মাথায় আঘাত করলে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
নড়াইল : নড়াইল-২ আসনে গাবতলা এলাকায় ধানের শীষ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী কলস প্রতীকের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে দুই নারীসহ ১৪ জন আহত হয়েছেন। গতকাল বিকাল সাড়ে ৫টায় সদরের গাবতলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। দুপক্ষের সমর্থকরা এ ঘটনায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেন।
পঞ্চগড় : জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা-কর্মীদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। তিনি বলেছেন, ‘ক্ষমতা চিরস্থায়ী কোনো বিষয় নয়। অতীত থেকে শিক্ষা নিন। মনে রাখবেন, এক মাঘে শীত যায় না। গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক স্ট্যাটাসে এ অভিযোগ করেন তিনি।’
স্ট্যাটাসে সারজিস লেখেন, ‘এখন পর্যন্ত পঞ্চগড়-১ আসনে প্রায় ৩০ প্লাস জায়গায় বিএনপির নেতা-কর্মীরা আমাদের নেতা-কর্মীদের ওপর, তাদের বাড়িঘরে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা করেছে, হুমকি দিয়েছে। অনেকে পালিয়ে আছে।’ তিনি আরও লেখেন, ‘বিএনপি কি এখনো পুরোনো কায়দায় প্রতিহিংসার রাজনীতি করতে চায় কি না সেটা বিএনপিকে স্পষ্ট করতে হবে। আমরা রাজনীতি করতে এসেছি। পুরোনো নোংরা রাজনৈতিক কালচারগুলোকে পরিবর্তন করে নতুন রাজনীতি করতে এসেছি।’
এদিকে দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ফেসবুকে এক পৃথক স্ট্যাটাসে লেখেন, সারা দেশে বিভিন্ন স্থানে এনসিপি এবং ১১-দলীয় জোটের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা করা হচ্ছে। তাদের বাড়িঘর এবং পরিবার হুমকির সম্মুখীন। যারা বিজয়ী হয়েছেন তারা নিজেদের নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করুন। গণতান্ত্রিক উত্তরণের শুরুটাই যদি বিরোধী দল ও মতের মানুষদের নিপীড়নের মধ্য দিয়ে হয় তা হবে আমাদের জন্য লজ্জাজনক।