দৃশ্যপট-০১ : রাজধানীর রূপনগর আবাসিক এলাকায় ভ্যানে সবজি বিক্রি করে সংসার চালায় দুলাল। নির্বাচনের পর কী প্রত্যাশা? এমন প্রশ্নের একটাই উত্তর আসে তার মুখ থেকে। ফাল্গুনের দুপুরে ঘাড়ের গামছায় কপালের ঘাম মুছে জবাব দেন, ‘আন্দোলন-ফান্দোলন মেলা অইছে, অহন এট্টু শান্তি চাই।’
দৃশ্যপট-০২ : নির্বাচনের পর এখনো ঢাকা জমে ওঠেনি। দীর্ঘ ছুটি পেয়ে বিভিন্ন পেশার মানুষ যারা বাড়ি গিয়েছিলেন, তারা ফিরছেন। ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে ঢাকায় ফেরা এমনই এক গার্মেন্টশ্রমিক সাইদুল জানান, ‘গত দেড় বছর মেলা গন্ডগোল অইছে। মানুষ পুড়াইয়াও মারছে। এইসব মব-টব দেখবার চাই না আর। দেশে শান্তি চাই।’
দৃশ্যপট-০৩ : রাজধানীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত সহকারী শিক্ষিকা প্রিয়াঙ্কা একটু ভিন্নভাবে প্রশ্নের উত্তরটি দেন। তিনি বলেন, ‘গত দেড় বছর কোথাও কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়েছে। এমন কি নিজ প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদেরও কিছু বলতে পারিনি। শ্রেণিকক্ষে বিশৃঙ্খলা করলেও শাসন করতে পারিনি। সব সময় একটা ভয় ছিল। কী থেকে কী হয়ে যায়...। নির্বাচনের পর এই ভয়ের পরিবেশটা কেটে যাক। আমরা এখন শান্তি চাই, সবখানে শৃঙ্খলা চাই...।’
দৃশ্যপট-০৪ : অ্যাডভোকেট সাইফুর রহমান, পেশায় আয়কর আইনজীবী। রাজধানীর পল্টন থেকে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে তিনি বলেন, ‘গত দেড় বছর দেশের পরিস্থিতি এত নাজুক ছিল যে, মানুষ সংসার চালাতে হিমশিম খেয়েছে। বেশির ভাগ মানুষের আয় কমেছে। দেশের ব্যবসাবাণিজ্যে আস্থার পরিবেশ ছিল না। রাস্তাঘাট, কলকারখানা, এমন কি কর্মরত প্রতিষ্ঠানেও মানুষ নিরাপদ ছিল না। কে, কাকে, কখন, কী বলে- দোষারোপ করে, রাজনৈতিক বিভেদ ছড়িয়ে দেয়- সেই ভয় ছিল মানুষের মনে। এসব আমরা দেখতে চাই না। আমরা বাংলাদেশের মানুষ- শান্তি পছন্দ করি, আমরা স্বস্তিতে থাকতে চাই।’ মানুষগুলো ভিন্ন ভিন্ন, তাদের জীবন-জীবকা, পেশাও ভিন্ন। তবে চাওয়াটা এক। মানুষ চায় শান্তি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দেশে একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কয়েম করেছিল; রাষ্ট্রের প্রতিটি খাত ভেঙে পড়েছিল; নজিরবিহীন লুটপাট, ব্যাংক দখল এবং বেনামি ঋণের মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের অর্থ পাচার করা হয়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ছাড়িয়েছে এবং ব্যাংকিং খাতের ৮০ শতাংশ অর্থই বাইরে চলে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দলীয়করণের ফলে স্বাস্থ্যসেবার মান মারাত্মকভাবে হ্রাস পায় এবং বাজেট বরাদ্দের একটি বড় অংশ দুর্নীতির কবলে পড়ে। শিক্ষাব্যবস্থায় অপ্রয়োজনীয় কারিকুলাম পরিবর্তন এবং দলীয় রাজনীতির প্রভাবে ব্যাপক অস্থিরতা ও বিপর্যয় দেখা দেয়। পরপর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে ফেলার অভিযোগ আন্তর্জাতিকভাবেও আলোচিত হয়। রাষ্ট্রের এই বিপর্যয় থেকে বাঁচতেই দেশের মানুষ দলমত নির্বিশেষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়েছিল। সেই আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল এবার শান্তি ফিরে আসবে। তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর আবদুল বায়েস বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘একটি সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবের কারণে যখন রাষ্ট্র বিপর্যয়ে পড়ে- তখন দেশের মানুষ অপেক্ষায় থাকে একটি আহ্বানের। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অরাজনৈতিক ছাত্ররা যখন সেই আহ্বান জানাল, মানুষ তাৎক্ষণিক সেই আহ্বানে সাড়া দিল। দলমত, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সবাই আন্দোলনে শরিক হলো। সরকার পতনের মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলন সফল হওয়ার পর দেখা গেল, বিভক্তি আরও বেড়ে গেছে।’
বিশিষ্ট এই শিক্ষাবিদ জানান, সমাজে এত বেশি বিভক্তি আর কখনো দেখা যায়নি। দলে দলে, ধর্মে ধর্মে, সেই বিভেদ, হানাহানি আর ঘৃণা এত বেশি ছড়িয়ে গেল যে, মানুষ দলবেঁধে মাজার ভাঙল, ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারল...। কথায় কথায় মব ভায়োল্যান্সের মতো সহিংস ঘটনা ঘটতে লাগল। এই যে অনিশ্চয়তা, এটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করল অর্থনীতির। ব্যবসাবাণিজ্যে স্থবিরতার কারণে শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেল। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী নতুন করে ৪০ লাখ লোক বেকার হলো। শুধু তাই নয়, ব্যবসাবাণিজ্য এমন কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও সেই বিভেদ আর হানাহানি ছড়িয়ে দেওয়া হলো। কারও কারও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে। হয়রানির উদ্দেশে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে কারও কারও নামে। শুধু কি ব্যবসায়ী, মিথ্যা অভিযোগে হয়রানির উদ্দেশে হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সাবেক এই শিক্ষক বলেন, আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে যে স্বৈরতন্ত্র কায়েম হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তা কমেনি। মানবাধিকার পরিস্থিতিরও উন্নতি হয়নি। অনাচার আরও বেড়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের মধ্যে ভয়, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তাও বেড়েছে। তবে এসব কিছুর পরও একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করতে পেরেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এখন দেশের মানুষ এই উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তা থেকে রেহাই পেতে চায়। তারা সবখানে, সর্বক্ষেত্রে শান্তির পরিবেশ চায়।