‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরাপত্তা বাহিনী ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রশংসনীয়ভাবে দায়িত্ব পালন করেছে। বহু বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর ভোটের দিনটি শান্তিপূর্ণ ও বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। বিগত সংসদ নির্বাচনের চেয়ে ভোটার উপস্থিতি বেশি ছিল। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেনি। ভোটদানে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এটি বাংলাদেশের জন্য বড় অগ্রগতি। তবে অনেক ভোটার গণভোটের অর্থ নিয়ে বিভ্রান্ত ছিলেন। অনেক ভোট কেন্দ্র প্রতিবন্ধীবান্ধব ছিল না। এ ছাড়া একটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ স্থগিত করায় ব্যালটে সমস্ত রাজনৈতিক পছন্দের প্রতিনিধিত্ব করা হয়নি।’ গতকাল ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে প্রাথমিক মূল্যায়নে এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে।
আইআরআই তাদের ওয়েবসাইটে প্রাথমিক মূল্যায়নটি প্রকাশ করেছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকেও মূল্যায়নটি সরবরাহ করা হয়। আইআরআই ঢাকায় আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের একটি প্রতিনিধিদল পাঠায়। এর আগে সংস্থাটির দীর্ঘমেয়াদি বিশ্লেষকরা অক্টোবরে নির্বাচনপূর্ব পরিবেশ এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে বাংলাদেশে এসেছিলেন। নির্বাচনের দিন ছয়টি পর্যবেক্ষক দল ঢাকা ও চট্টগ্রামের ৭২ কেন্দ্রে ভোটদান প্রত্যক্ষ করেছে। এ ছাড়া প্রাক্তন মার্কিন কংগ্রেসম্যান ডেভিড ড্রেইয়ারের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি নির্বাচনি পরিবেশ এবং গণতান্ত্রিক পুনর্নবীকরণের সম্ভাবনা মূল্যায়ন করতে নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকর্তা, নাগরিক সংগঠনসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।
প্রাথমিক মূল্যায়নে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবারের নির্বাচনপূর্ব সময় তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে ভোট গ্রহণের আগের সপ্তাহগুলোতে দেশব্যাপী শত শত সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। নির্বাচনের আগমুহূর্তে ১৮ বছর বয়সি নাগরিকদের ভোটদানের অনুমতি দেওয়ায় অংশগ্রহণ বেড়েছে। তবে ঐতিহাসিকভাবে ভোটে নারীর কম অংশগ্রহণ ছিল উদ্বেগজনক। ইতিবাচক ছিল এবার অনেকে প্রথমবারের মতো ভোট দিতে পেরেছেন। ভোটার উপস্থিতি ৫৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা পূর্ববর্তী সংসদীয় নির্বাচনের তুলনায় বেশি। ইসির প্রস্তুতি ও উপকরণ সরবরাহ ছিল প্রশংসার যোগ্য। প্রবাসীদের ডাকযোগে ভোটদানের ব্যবস্থা গ্রহণ, নাগরিক পর্যবেক্ষকদের স্বীকৃতি প্রদানের মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা এবং দেশব্যাপী ভোটার শিক্ষা প্রচার চালু করার মতো সংস্কারগুলো স্বচ্ছতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়িয়েছে। রাজনৈতিক দলের পোলিং এজেন্ট, নাগরিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ অনেক ভোট কেন্দ্রে উচ্চস্তরের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে। প্রার্থীর মধ্যে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুর পাশাপাশি নারীর উল্লেখযোগ্য কম প্রতিনিধিত্ব গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটির নির্বাচনে অংশগ্রহণ স্থগিত করার ফলে ব্যালটে সমস্ত রাজনৈতিক পছন্দের প্রতিনিধিত্ব করা হয়নি। নির্বাচনে একজন প্রধান রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুপস্থিতি প্রতিযোগিতার পরিধিকে সংকুচিত করে তুলেছিল।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ভোট গ্রহণ সময়মতো শুরু হয়েছিল, প্রয়োজনীয় উপকরণ উপস্থিত ছিল এবং প্রিসাইডিং অফিসাররা পেশাদার এবং কার্যকর ছিলেন। ভোটদানে কোনো হস্তক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। অনেক কেন্দ্র ওপরের তলায় অবস্থিত ছিল এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশযোগ্য ছিল না। অনেক ভোটার গণভোটের ব্যালটের অর্থ এবং সারাংশ সম্পর্কে বিভ্রান্ত ছিলেন এবং তারা পোলিং এজেন্ট ও অফিসারদের কাছ থেকে যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন, যা কখনো কখনো তাদের ব্যালটের গোপনীয়তা নষ্ট করেছিল। নির্বাচনটি উচ্চ নিরাপত্তা ও সতর্কতার অধীনে পরিচালিত হয়েছে। পুলিশ, সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন, আনসার এবং গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ব্যাপকভাবে মোতায়েন করা হয়েছিল। হাজার হাজার কেন্দ্রকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। এ ব্যবস্থাগুলোর কারণে সহিংসতা সীমিত ছিল।’