ইফতারে শাহি খাবার না থাকলে ঢাকাইয়াদের রসনাবিলাস যেন অসম্পূর্ণই থেকে যায়। ঐতিহ্য, আভিজাত্য, স্বাদ, মান সব দিক বিবেচনায় চকবাজারের মুখরোচক ইফতার ঢাকার শাহি খানাপিনারই একটি অংশ। ৪০০ বছরের ইতিহাসে ইফতারে ঢাকার শাহি খানাপিনা যে এখনো শীর্ষস্থান দখল করে আছে তার প্রমাণ দেয় পুরান ঢাকার চকবাজার। আধুনিকতা ও প্রযুক্তির এ পরিবর্তিত সময়ে সবকিছু পালটে গেলেও পাল্টায়নি চকবাজারের ইফতারের ঐতিহ্য। পুরান ঢাকার শাহি খাবার ও মোগল ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে থাকা চকবাজারের ইফতার। এটি ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী।
৪০০ বছর আগে মোগল সুবেদার শায়েস্তা খান চকবাজারে শাহি মসজিদ তৈরি করেন। আর ওই বছর রমজানকে কেন্দ্র করেই শাহি মসজিদ ও এর আশপাশে গড়ে ওঠে ইফতার বাজার। আর সেই থেকে টানা সাড়ে ৩০০ বছর ধরে ঐতিহ্যের সঙ্গে পথ চলে এখনো ইফতার বাজারে সবার ভালো লাগার জায়গা চকবাজারের ইফতার বাজার। এ এলাকার বাসিন্দারা জানান, দুপুর ২টার পর থেকে শুধু পুরান ঢাকার বাসিন্দারাই নন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা ছুটে আসেন ইফতার কিনতে। গতকাল ছুটির দিন বিকালে সরেজমিন দেখা যায়, চকবাজারের ইফতার কিনতে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়।
ইফতারের মেন্যুতে পাওয়া যাচ্ছে সুতি কাবাব, জালি কাবাব, টিক্কা কাবাব, মোরগ পোলাও, লাবাং, পরোটা, বিভিন্ন ধরনের কাটলেট, শাহি জিলাপি, পিঁয়াজু, শাকপুলি, ডিম চপ, কাচ্চি বিরিয়ানি, তেহারি, কবুতর ও কোয়েলের রোস্ট, খাসির রানের রোস্ট, দইবড়া, আস্ত রাজ হাঁসের ফ্রাই, হালিম, নুরানি লাচ্ছি, পনির, পেস্তা বাদামের শরবত, ছানামাঠা, কিমা পরোটা, ছোলা, ঘুগনি, বেগুনি, আলুর চপ ইত্যাদি। এ এলাকার ইফতারের অন্যতম আকর্ষণীয় ও লোভনীয় খাবার হচ্ছে ‘বড় বাপের পোলায় খায়’। বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় এবারও মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এ খাবারটি। গত চার বছর ধরে একই দামে বিক্রি হচ্ছে ‘বড় বাপের পোলায় খায়’। চার বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও বড় বাপের পোলায় খায় বিক্রি হচ্ছ ৮০০ টাকা কেজিতে।
‘বড় বাপের পোলায় খায়’-এর বিক্রেতা জানান, তার দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখতেই তিনি এখনো এই আইটেমটি বিক্রি করছেন। প্রায় ৭৮ বছর আগে এখানে এই আইটেম নিয়ে বসতেন মোহাম্মদ হোসেনের দাদু। এখন তিনি ও তার ভাই পূর্ব পুরুষদের সেই ঐতিহ্য ধরে রেখে প্রতি রমজানে বিক্রি করছেন ঢাকাবাসীর প্রিয় এই শাহি ইফতার। এ বাজারের ইফতারের অন্যতম সুস্বাদু খাবার গরুর সুতি কাবাব বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১ হাজার এবং খাসির সুতি কাবাব বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকায়। এ ছাড়া প্রতি কেজি শাহি ছোলা ২৮০, ঘুঘনি ১৪০, চিকেন আচারি ১ হাজার ৩০০ এবং কাশ্মীরি বিফ আচারি ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া অন্য খাবারগুলোর মধ্যে প্রতিটি জালি কাবাব ৩০, টানা পরোটা ৫০, কিমা পরোটা ৭০, কাঠি কাবাব ৪০ এবং ডিম চপ ৫০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। পাশাপাশি দইবড়া ১০০ টাকা (তিনটি), ফালুদা কেজি ২২০ টাকা, পেস্তা বাদাম শরবত ২৫০ টাকা লিটার, মুরগির ললিপপ প্রতিটি ৪০ টাকা, চিকেন ফিংগার ৪০ টাকা, চিকেন স্যান্ডুইচ ৫০ টাকা, চিকেন ¯িপ্রং রোল ৪০ টাকা, ভেজিটেবল রোল ৩০ টাকা, চিকেন রোল প্যাটিস ৪০ টাকা, চিকেন প্যাটিস ৫০ টাকা, চিকেন শর্মা ৭০ টাকা, চিকেন রেশমি কাবাব ৫০ টাকা, মিনি পিৎজা ৭০ টাকা এবং চিকেন টিক্কা ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আস্ত রাজহাঁসের কাবাব বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ টাকায়, কায়েল ফ্রাই ৮০ টাকা, মুরগি ফ্রাই ৪০০ টাকা, গুটি কাবাব কেজি ১২ শ, দইচিঁড়া হাফ কেজির বাটি ৮০ টাকা, শাহি জিলাপি কেজি ৩০০-৪০০ টাকা পর্যন্ত। পেঁপের শরবত ৫০, তরমুজের শরবত ৮০ টাকা, মালপোয়া পিস ২৫ টাকা, কিমা সমুচা ১৫ টাকা, চিকেন ফ্রাই ৪৫ টাকা পিস, চিকেন শর্মা ৪০, চিকেন সাস্লিক ৩৫ টাকা, চিকেন কাকোজ ৪০ টাকা, দইবড়া ৫ পিস ১০০ আর ১০ পিস ২০০ টাকা, চিকেন টোস্ট ৪০-৪৫ টাকা, কাশ্মীরি নান ১০০-১২০ টাকা, গরুর কোপ্তা ২০ টাকা পিস, চিকেন রোল ৬০ টাকা, বিফ রোল ৮০, খাসির লেগ পিস ৮০০ টাকা, আস্ত মুরগি ৫০০ টাকা, খাসির ঝুরা মাংস ১৬ শ টাকা কেজি, কাশ্মীরি চিকেন কাবাব ২০০, চিকেন টিক্কা ২৫০ টাকা, গরুর শিক কাবাব ২০০, আফগানি বিফ লতা কাবাব ২০০ টাকা, তন্দুরি চিকেন পিস ১৫০ টাকা, খাসির বটি কাবাব ২০০ টাকা, চিকেন বটি কাবাব ২০০ টাকা, স্পেশাল দুধ নান ৬০ টাকা, কাশ্মীরি নান ১০০ টাকা, বাটার নান ৫০ টাকা, মুরগির আচার ৩০০ টাকা কেজি, কোয়েল ভুনা প্রতি পিস ৮০ টাকা, কোপ্তা চিকেন প্রতি পিস ২০ টাক, জর্দা ১০০, জিলাপি ২৫০ কেজি, মালাই জিলাপি ৬০০ টাকা কেজি, মাঠা ৬০ ও ১২০ টাকা। চকবাজারের ইফতার বাজারে কথা হয় রাজধানীর বাসাবো থেকে আগত মাসফি রাজীব ও মৌ দম্পত্তির সঙ্গে। রাজীব বলেন, লালবাগ আমার আদি নিবাস। চকবাজারের ইফতার ছাড়া আমার চলেই না। এটি শুধু ইফতার নয়, যেন এক টুকরো আবেগ।