পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের মহা আয়োজন থাকলেও গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কাছে ছিটেফোঁটা তথ্যও ছিল না। অন্ধকারে ছিল তৎকালীন বিডিআর (বাংলাদেশ রাইফেলস) এর নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থাও। শুধু তাই নয়, হত্যাযজ্ঞ চলাকালীন পুরো ৩৬ ঘণ্টা বিদুৎসহ অন্যান্য সেবা সংস্থার ভূমিকা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।
অন্যদিকে, জিম্মিদের পরিস্থিতি না জেনেই বিদ্রোহীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে সরকারের শীর্ষ মহল। জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিদ্রোহের আগে বিডিআর সদস্যদের বিতরণ করা লিফলেটে সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি হুমকি ছিল। ২১ ফেব্রুয়ারি সদর দপ্তরের ভিতরে এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি ফার্মগেটে থেকে একই লিফলেট উদ্ধার হয়। তবু হুমকিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো লিফলেট সম্পর্কে অবগত থাকলেও করণীয় বিষয়ে কার্যকর পরামর্শ দেয়নি। আরেকটি প্রভাবশালী সংস্থার কোনো কার্যক্রম ছিল না প্যারামিলিটারি ফোর্সে ওপর। তবে ২০০৯ সালের জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, এনএসআই লিফলেটটি হাতে পেয়েছিল। পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) কোনো আগাম সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি।
সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বক্তব্যে দেখা যায়, ২৫ ফেব্রুয়ারির বিদ্রোহ সম্পর্কে লিফলেটের হুমকি ছাড়া তাদের কাছে নির্দিষ্ট কোনো আগাম তথ্য ছিল না। তবে তদন্ত নথিতে মন্তব্য করা হয়েছে বিডিআরের মতো একটি বাহিনীতে এমন পরিকল্পনা চললেও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল। এ দাবি গ্রহণযোগ্য নয়।
বিডিআরের নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিট (আরএসইউ) পরিকল্পনার কোনো আভাস পায়নি। তদন্তে বলা হয়েছে, অন্তত দুই মাস আগে পরিকল্পনা শুরু হলেও আরএসইউ তা ধরতে ব্যর্থ হয়। দরবার শুরুর আগেই অস্ত্রাগার দখল হলেও তাদের কোনো পূর্বাভাস ছিল না। এটিকে চরম অদক্ষতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আরএসইউর কর্মকর্তারা অন্ধকারে থাকলেও তাদের অধস্তনরা বিদ্রোহ সম্পর্কে অবগত ছিল। একই সঙ্গে তাদের অনেকেই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছে।
সিদ্ধান্তহীনতা ও প্যারালাল কমান্ড : প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে সেনাবাহিনীর ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেড দ্রুত পিলখানার কাছাকাছি পৌঁছায়। কিন্তু তাদের ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও পাল্টা গুলি চালানোর নির্দেশ মেলেনি। আনুষ্ঠানিক কমান্ড চ্যানেলের বাইরে মৌখিক নির্দেশ ও প্যারালাল কমান্ডের প্রভাব পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। রাজনৈতিক সমাধানের নামে সময়ক্ষেপণ চলতে থাকে। এই সময়ের মধ্যে পিলখানার অভ্যন্তরে চলতে থাকে নারকীয় হত্যাকাণ্ড। লাশ গুম ও আলামত ধ্বংসের সুযোগ তৈরি হয়।
র্যাব ও পুলিশ ভিতরে প্রবেশের অনুমতি না পেয়ে বাইরে অবস্থান নেয়। র্যাব-২ ও র্যাব-৩-এর দল ঘটনাস্থলের কাছে থাকলেও অভিযান চালানো হয়নি। তৎকালীন কোম্পানি কমান্ডার ক্যাপ্টেন রেজাউল করিম নিউমার্কেট গেটে গুলি করলে তাকে তাৎক্ষণিক স্ট্যান্ড রিলিজ করেন অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল রেজানুর খান। কিছুদিন পর তাকেসহ মোট পাঁচজন সেনা কর্মকর্তাকে গুম করা হয়।
বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রাখা হয় : ২৫ ফেব্রুয়ারি রাত আটটার পর পিলখানার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তদন্তে উল্লেখ আছে, বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে এর স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় ভিতরে অপরাধ সংঘটনের সুযোগ আরও বেড়েছিল বলে নথিতে বলা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বিদ্রোহীদের প্রতিনিধি দল গেলে তাদের পরিচয় লিপিবদ্ধ করা হয়নি এ অভিযোগও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এ ধরনের ঘাটতিকে দায়িত্বহীনতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিকল্পিত হামলা, পরবর্তী বিচার : তদন্ত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অস্ত্রাগার দখল, দরবারে হামলা, সমন্বিত আক্রমণ সব মিলিয়ে এটি ছিল সুপরিকল্পিত। ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন ও ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। ২৭৮ জন খালাস পান। বিচারকালীন চার আসামি মারা যান। নথিপত্রের এসব পর্যবেক্ষণ গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা কাঠামোর সক্ষমতা, সমন্বয় এবং সেবা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
প্রসঙ্গত ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানায় তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) সদর দপ্তরে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন নিহত হন। গণ অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিডিআর হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্যউন্মোচনে দীর্ঘ ১৬ বছর পর অন্তর্র্বর্তী সরকারের উদ্যোগে গঠিত হয় জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন। গত ৩০ নভেম্বর কমিশনের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান অন্য সদস্যরা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কাছে এই প্রতিবেদন জমা দেন।