ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে সারা বিশ্বেই। যুদ্ধে না জড়িয়েও বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বাজারে বাড়তে শুরু করেছে বিভিন্ন আমদানি পণ্যের দাম। একই সঙ্গে পণ্যের সংকটও দেখা দিয়েছে। ফলে পরিস্থিতি সামলাতে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। ঈদের পরই প্রাক-বাজেট আলোচনা শুরু করবেন অর্থমন্ত্রী ও এনবিআর চেয়ারম্যান। তার আগে আর্থিক মুদ্রা ও বিনিময় হারসংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের বৈঠক করবেন অর্থমন্ত্রী। গত বছরের নভেম্বরের শুরুতে চলতি অর্থবছরের কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নতুন বাজেটেও ব্যয়সংকোচন নীতি অনুসরণ করার কথা। কিন্তু নতুন সরকার সে নীতি থেকে বেরিয়ে উদার ব্যয়নীতি চালু করতে চায়। তবে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১৫ দিনের মাথায় শুরু হয়েছে যুদ্ধ। নতুন সরকার যখন নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও উন্নয়ন বাজেট প্রণয়নে মনোযোগ দিয়েছে, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যসংকট সরকারকে নতুন করে ভাবনায় ফেলেছে। তাই আগামী বাজেট নিয়ে শুরুতে এক রকম চিন্তা করা হলেও সেখান থেকে সরে আসতে হচ্ছে সরকারকে। অর্থাৎ নতুন সরকারের বাজেট ভাবনায় যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানান, জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্য, মূলধনি যন্ত্রপাতি, এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে নতুন চিন্তাভাবনা করছে সরকার। তারা মনে করছে, আগের নীতিতে বহাল থাকলে সংকট আরও বাড়তে পারে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যয়সংকোচন নীতি থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা করলেও নতুন সরকার যুদ্ধের প্রভাবে শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর করতে পারবে কি না, এ নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে আগের সরকারের ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে উচ্চতর প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে নির্দেশনা দিয়েছিল তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। এজন্য নতুন বাজেটকে কর্মসংস্থান, বিনিয়াগ, প্রবৃদ্ধিসহায়ক হিসেবে প্রণয়ন করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী অর্থ মন্ত্রণালয় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৮ লাখ ৪৮ হাজার থেকে ৮ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। সূত্রমতে প্রস্তাবিত সেই বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার হতে পারে আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। পরে তা ২ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয় ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এদিকে রাজস্ব আদায় পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে তাদের কার্যক্রম জোরদার করতে বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) রাজস্ব ঘাটতি ছাড়িয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। আইএমএফের ‘আর্টিকেল ফোর কনসালটেশন রিপোর্ট’ অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপেছে দেশিবিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ বাবদ ৩০ বিলিয়ন ডলার। বছর শেষে এ ঘাটতি লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করা হবে, তা নিয়ে জটিলতায় পড়েছে অর্থ বিভাগ ও এনবিআর। কেননা চলমান ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি হবে এক রকম। আবার যুদ্ধ থেমে গেলে পরিস্থিতি হবে আরেক রকম। ফলে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে সরকার। একই সঙ্গে জরুরি পণ্য হিসেবে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও খাদ্যপণ্যের মজুত কিছুটা বাড়ানোর কথা ভাবছে সরকার। যদিও ইতোমধ্যে এসব পণ্যের আমদানি কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এদিকে সিপিডি মনে করে, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দেশের অর্থনীতিতে জনগণ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। আসছে বাজেটটা হবে সরকারের জন্য নতুন। সেই বাজেটে সরকার কী ধরনের নীতি পলিসি গ্রহণ করবে তার ওপর নির্ভর করবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও যুদ্ধ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে অর্থনীতিকে টেনে তুলতে হবে। এজন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ। ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বসে বেসরকারি খাতের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং তা সমাধানে জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যাংকঋণের সুদহার কমাতে হবে। গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়াতে হবে। আমরা আশা করি নতুন সরকার দ্রুততম সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক করতে উদ্যোগী হবে।’