বাংলাদেশের মানুষের ওজনাধিক্য ও স্থূলতা ক্রমেই মহামারির রূপ নিচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, স্থূলতার সঙ্গে অন্তত ২০০ ধরনের রোগের সরাসরি বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমলে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ, ফ্যাটি লিভার, লিভার সিরোসিস, ক্যানসার, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা, বন্ধ্যত্ব ও ব্যাক পেইনসহ নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অপর্যাপ্ত ঘুম ও স্ক্রিননির্ভর জীবনযাপন এর প্রধান কারণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুদূষণ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধিও স্থূলতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। গতকাল ইডব্লিউএমজি পিএলসি কনফারেন্স কক্ষে ‘স্থূলতার বহুমাত্রিক ঝুঁকি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য তুলে ধরেন বক্তারা। বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির উদ্যোগে অপসোনিন ফার্মা লিমিটেডের সহযোগিতায় বাংলাদেশ প্রতিদিন এ গোলটেবিলের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি ও বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির অনারারি প্রেসিডেন্ট জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান। অন্য অতিথিদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও বারডেমের পরিচালক (একাডেমি) অধ্যাপক ডা. মো. ফারুক পাঠান, ইউনাইটেড হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান, মুগদা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. শাহাবুল হুদা চৌধুরী, গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. তানজিনা হোসেন, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আফসার আহাম্মদ, ডা. তানিয়া হক, ডা. শাহজাদা সেলিম, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ডা. এম সাইফুদ্দিন, সহযোগী অধ্যাপক ডা. মির্জা শরীফুজ্জামান, সহকারী অধ্যাপক ডা. তানজিনা জান্নাত শাম্মী, অপসোনিন ফার্মা লিমিটেডের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার (প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট) তাজ মো. আগা মেনন, সিনিয়র সেলস ম্যানেজার মোহাম্মদ শামসুল আরেফিন মজুমদার, ম্যানেজার (পিএমডি) মোহাম্মদ আরিফ খান, বসুন্ধরা মেডিকেল সিটির উদ্যোক্তা ও এস রহমান গ্রুপের চেয়ারম্যান এস এম সাহিদুর রহমান প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক মন্জুরুল ইসলাম। অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, স্থূলতা একটি গুরুতর রোগ হলেও এ বিষয়ে সচেতনতা এখনো কম। ডায়াবেটিস সম্পর্কে মানুষ যতটা সচেতন, স্থূলতা সম্পর্কে ততটা নয়। নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম ও শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপনই এর প্রধান প্রতিকার। শিশুদের খেলাধুলার সুযোগ বাড়াতে হবে এবং কোমল পানীয়ের ব্যবহার কমাতে হবে। অধ্যাপক ডা. মো. ফারুক পাঠান বলেন, স্থূলতা শুধু শারীরিক নয়; সামাজিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গেও জড়িত। ওয়ার্ল্ড ওবেসিটি ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে স্থূলতাজনিত রোগের চিকিৎসায় বছরে প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে, যা ২০৬০ সালে ৫৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। অধ্যাপক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান বলেন, স্থূলতা একটি দীর্ঘমেয়াদি মেটাবলিক রোগ। শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমলে প্রদাহজনিত রাসায়নিক তৈরি হয়, যা হৃদযন্ত্র, লিভার, কিডনি ও রক্তনালিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতা বাড়ায়।
অধ্যাপক ডা. শাহাবুল হুদা চৌধুরী বলেন, স্থূলতা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও ফ্যাটি লিভারের মতো অসংক্রামক রোগের প্রবেশদ্বার। চিনিযুক্ত পানীয়ের ব্যবহার কমাতে কর বাড়ানোর প্রস্তাব দেন তিনি। পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য বিএমআই মানদণ্ড কিছুটা কম নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
অধ্যাপক ডা. তানজিনা হোসেন বলেন, দেশে নারীদের মধ্যে স্থূলতার হার উদ্বেগজনক। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৬.৫ শতাংশ নারী স্থূলতায় ভুগছেন। শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং সন্তান জন্মের পর ওজন নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ না নেওয়াই এর প্রধান কারণ। ডা. তানিয়া হক বলেন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্ক্রিন টাইম সীমিত রাখা স্থূলতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ওজন কমানোর ওষুধ বা সার্জারিও কার্যকর হতে পারে। ডা. মির্জা শরীফুজ্জামান বলেন, শিশুদের মধ্যে স্ক্রিননির্ভর জীবনযাপন বাড়ায় স্থূলতার ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের প্রায় ৩৩ শতাংশ শিশু স্থূলতায় ভুগছে। বায়ুদূষণ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধিও শারীরিক কার্যক্রম কমিয়ে এ সমস্যাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে ১ বিলিয়নের বেশি মানুষ স্থূলতায় আক্রান্ত। স্থূলতার সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক, স্লিপ অ্যাপনিয়া ও অন্তত ১৩ ধরনের ক্যানসারের সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত ঘুমের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। ডা. এম সাইফুদ্দিন বলেন, শহরের শিশুদের মধ্যে ফাস্টফুডের সহজলভ্যতা, কম ঘুম, মানসিক চাপ ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাব স্থূলতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ডা. আফসার আহাম্মদ বলেন, শৈশবের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁঁকিতে বড় ভূমিকা রাখে, যাকে ‘মেটাবলিক মেমোরি’ বলা হয়। তাই শিক্ষাক্রমে পুষ্টিবিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করা এবং শিশুদের নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
ডা. তানজিনা জান্নাত শাম্মী বলেন, স্থূলতা শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং সামাজিক সংকোচ তৈরি হয়। বডি শেমিং বন্ধে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। তাজ মো. আগা মেনন বলেন, স্থূলতা ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থারও উন্নতি হয়েছে। এ লক্ষ্যে অপসোনিন ফার্মা নিয়ে এসেছে বিশ্বের সর্বাধিক প্রচলিত টিরজেপাটাইড প্রিপারেশন ‘ডুওটির’, যা ডায়াবেটিস এবং স্থূলতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বসুন্ধরা মেডিকেল সিটির উদ্যোক্তা ও এস রহমান গ্রুপের চেয়ারম্যান এস এম সাহিদুর রহমান বলেন, স্থূলতা প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এই লক্ষ্যে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এন ব্লকে নির্মাণাধীন বসুন্ধরা মেডিকেল সিটিতে পরিকল্পিত স্থূলতা নিরাময় ইউনিটে ফিজিওথেরাপি, বিশেষায়িত ব্যায়াম নির্দেশনা, মেডিসিন সাপোর্ট ও খাদ্যাভ্যাসবিষয়ক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকছে।